বিএনপি সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ঘাটতি ও ঋণ নির্ভরতার বাজেট হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতীয় পার্টির (একাংশ) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন এবারের বাজেট সম্ভাবনার আলোকবর্তিকা এবং বাস্তবায়নের এক কঠিন পরীক্ষার নাম। তিনি বলেন, বাস্তবিক অর্থে আমরা একটা কঠিন সময় পার করছি। এই কঠিন সময়কে মোকাবিলা করার লক্ষ্য নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে। ফলে এখানে জনগণের কল্যাণ ও দেশের উন্নয়নের জন্য বিশাল প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে সরকারকে। কিন্তু বাস্তবতায় রয়ে গেছে রাজস্বের দুর্বল ভিত্তি। বাজেটকে একদিকে বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিমুখী একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট বলা যায়। অন্যদিকে, এর প্রধান দুর্বলতা হলো রাজস্ব আহরণের অনিশ্চয়তা, বড় ঘাটতি, ঋণনির্ভর অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অস্পষ্টতা।
শনিবার গুলশানের নিজ বাসভবনে বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় পার্টি (একাংশ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, তবে নিঃসন্দেহে সার্বিক বিবেচনায়, এ বাজেট জনগণকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে সরকারের দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।
লিখিত বক্তব্যে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, আগে জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর বিরোধী দলগুলো প্রায় নিয়মিতভাবেই এর বিরোধিতা করত, বিক্ষোভ মিছিল করত এবং নানা সমালোচনা তুলে ধরত। অনেক ক্ষেত্রেই এই বিরোধিতা ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি প্রচলিত অংশ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকেই আশা করেছিলেন যে দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলোতে দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে যুক্তিনির্ভর ও গঠনমূলক আলোচনা গুরুত্ব পাবে।
তিনি বলেন, কিন্তু সাম্প্রতিক বাজেট ঘোষণার পর বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া দেখে সেই প্রত্যাশার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায়নি। তারা আগের মতোই বিক্ষোভ, মিছিল এবং সরাসরি বিরোধিতার পথ বেছে নিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সহনশীলতা ও গঠনমূলক সমালোচনার পরিবেশ গড়ে ওঠার আশা করা হয়েছিল, এই ধরনের আচরণ তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন জরুরি, না হলে কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রূপান্তর পূর্ণতা পাবে না।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের জনকল্যাণমুখী প্রচেষ্টা রয়েছে বাজেট প্রস্তাবনা। কিন্তু সক্ষমতা সীমিত। তাই ধারকর্জ আর রাজস্বের উচ্চাভিলাষী আদায়ের ওপর ভরসা করেই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও ইচ্ছা পূরণ করতে চায় সরকার। তবে আশঙ্কা করছি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে ঘোষিত এই বাজেট বাস্তবায়নই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দেওয়া, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ সঞ্চালন নিশ্চিত করা, ঋণ ধারণ সক্ষমতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছি। তাছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ভর্তুকি খরচ মেটানোর পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। দেশের রাজস্ব আদায়ের বর্তমান সক্ষমতা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নতুন বাজেটে যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা উচ্চাভিলাষী। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব না হলে অর্থায়নের চাপ আরও বাড়বে এবং পুরো বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের জন্য শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি সুশাসন, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয় সুরক্ষিত না হলে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, মানবাধিকার রক্ষা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জাতীয় পার্টির অনেক নেতা কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। একইসঙ্গে অন্যায়ভাবে অনেক নেতার বিরুদ্ধে বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করতে চাই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অবিলম্বে জাতীয় পার্টির নেতারা নেতাসহ যেসব নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে তা দ্রুত প্রত্যাহার করা হবে। একই বিদেশ যাত্রায় যে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাখা হয়েছে, তা দ্রুত তুলে নেয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির অংশটির নির্বাহী চেয়ারম্যান এডভোকেট মুজিবুল হক চুন্নু, সিনিয়র কো- চেয়ারম্যান এডভোকেট কাজী ফিরোজ রশিদ, কো- চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, জহিরুল ইসলাম জহির, মুসলিমলীগ সভাপতি - এডভোকেট মহসিন রশীদ, ইসলামিক মহাজোট- চেয়ারম্যান আবু নাসের অহেদ ফারুক, চেয়ারম্যানের বিশেষ সহকারী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসরিন জাহান রতনা প্রমুখ।
