বুধবার বিকাল। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বারান্দায় লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েক ডজন মানুষ। কারও হাতে ভাঁজ করা কাগজের আবেদন, কারও চোখে অসহায়ত্ব। কেউ এসেছেন কিডনি অপারেশনের টাকা জোগাড় করতে না পেরে, কেউ ছয় বছরের মেয়ের চিকিৎসার শেষ ভরসা নিয়ে, কেউবা বিদেশে বসে নিজের জমি রক্ষার আকুতি নিয়ে। এই মানুষগুলোর গল্প শোনার জন্যই প্রতি বুধবার টেবিলের ওপারে বসেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অনেকের কাছে তিনি এখন আর শুধু ‘ডিসি’ নন, ‘মানবিক ডিসি’।
৪২টি গল্প, একটাই ঠিকানা: গত ১০ই জুনের গণশুনানিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর থেকে আসা ৪২ জন সেবাপ্রত্যাশীর আবেদন শোনেন তিনি। প্রতিটি আবেদন মনোযোগ দিয়ে শোনেন, প্রশ্ন করেন, তারপর তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে। সেদিন ওঠে আসা গল্পগুলো যেন একেকটি জীবনসংগ্রামের দলিল। রাঙ্গুনিয়ার জঙ্গল দক্ষিণ নিশ্চিন্তাপুরের মো. আবদুল মজিদ হোসেন দীর্ঘদিন কিডনি রোগে ভুগছেন। ডাক্তার বলেছেন দ্রুত অপারেশন লাগবে। কিন্তু দিন আনা দিন খাওয়া সংসারে সেই টাকা কোথায়? শেষ ভরসা হিসেবে ছুটে এসেছেন ডিসি’র কাছে।
আনোয়ারার দিনমজুর নিজামুল হক এসেছেন ৬ বছরের মেয়ে রিয়াকে নিয়ে। ৭ মাস ধরে কিডনি জটিলতা আর ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমায় ভুগছে মেয়েটা। চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব তিনি। বাবার চোখে পানি, মুখে একটাই কথা- মেয়েটারে বাঁচান স্যার। মোহাম্মদ ইয়াছিনও আরেক কিডনি রোগী। ব্যয়বহুল চিকিৎসার চাপে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাদের সবার আবেদন শুনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন জেলা প্রশাসক। সেদিনই গুরুতর অসুস্থ ৮ জন রোগী ও ১ জন শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়। দু’জন দুস্থ মানুষের হাতে তুলে দেয়া হয় চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মসলা- সংসার চালানোর উপকরণ।
প্রবাসীর কষ্টও শোনেন অনলাইনে: মানবিক সহায়তার পাশাপাশি সেদিনই হয় প্রবাসীদের জন্য বিশেষ অনলাইন গণশুনানি। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি, মালয়েশিয়া থেকে চারজন প্রবাসী অনলাইনে যুক্ত হন। আরও তিনজন সরাসরি হাজির হন কার্যালয়ে। তাদের অভিযোগ- জমিজমা দখল, অর্থ আত্মসাৎ, নানা হয়রানি। জাহিদুল ইসলাম একে একে সবার কথা শোনেন। তারপর সংশ্লিষ্ট ইউএনও, থানার ওসিকে ফোনে নির্দেশ দেন, ‘দ্রুত খোঁজ নিন, নিষ্পত্তি করে রিপোর্ট দিন।’ গণশুনানি শেষে সহায়তা পাওয়া অনেকের চোখে ছিল স্বস্তির অশ্রু। কেউ ফিরেছেন চিকিৎসার টাকা নিয়ে, কেউ পেয়েছেন প্রশাসনের আশ্বাস, কারও ঘরের চাল বাড়লো কয়েক কেজি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, প্রশাসনের সাফল্য কেবল কাগজে-কলমে নয়, মানুষের মুখের হাসিতে। একজন অসহায় মানুষ যখন চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পান, তখন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব তাদের পাশে দাঁড়ানো। গণশুনানি শুধু অভিযোগ নেয়ার জায়গা না, এটি মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের আস্থার সেতুবন্ধন। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, প্রতি সপ্তাহে চিকিৎসা, শিক্ষা, জমিজমা বিরোধ, সামাজিক নিরাপত্তা- নানা সমস্যা নিয়ে মানুষ আসেন। অনেক সময় ৫ হাজার টাকার একটা সহায়তাই একটি পরিবারকে নতুন করে বাঁচার সাহস দেয়।
কঠোর প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর কারণেই ‘মানবিক ডিসি’ উপাধি পেয়েছেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া। প্রতি বুধবারের গণশুনানি এখন চট্টগ্রামের অসহায় মানুষের কাছে আশার আলো, আস্থার ঠিকানা। আবদুল মজিদের মতো রোগীরা যখন অপারেশনের টাকা হাতে পেয়ে কেঁদে ফেলেন, নিজামুল হকের মতো বাবারা যখন বলেন, ‘মেয়েটা বাঁচবে স্যার’, তখন বোঝা যায়- রাষ্ট্রের কাজটা আসলে কী।
