জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬-এর খসড়ার ওপর ভিত্তি করে গঠিত কমিশন কোনোভাবেই একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হবে না বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। গত ৮ই জুন সরকারের কাছে ১৯ দফা সুপারিশ পেশ করেছে সংস্থাটি। টিআইবি’র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় আইনটিতে এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা সরকারের প্রভাবমুক্ত একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘকাল লালিত জনআকাক্সক্ষার পরিপন্থি এবং প্যারিস নীতিমালা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
টিআইবি বলছে, প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে, যা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না উল্লেখ করা হয়। টিআইবি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, নতুন খসড়া আইনের ধারা ৩(২)-এ সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না- অংশটি বাদ দেয়া হয়েছে। যা নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক কমিশনকে করায়ত্ত করাসহ সংস্থাটিকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
বিশেষ গুরুত্বসহ টিআইবি খসড়া আইনের ধারা ১৩তে কয়েকটি বিধান অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। যেমন- সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা ও অনুরূপ নজরদারি সংস্থা এবং সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল যেখানে গুমসহ বিভিন্ন নির্যাতনের জন্য আটককৃত ব্যক্তিদের রাখার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন স্থানসমূহের নিয়মিত অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্ত করা; এইরূপ স্থান ও অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারের নিকট প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান এবং এ সকল স্থান আইনবহির্ভূত হলে, তা বন্ধ করা ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সরকারের নিকট সুপারিশ করা। এ ছাড়া, মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হলে, তাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে টিআইবি’র সুপারিশ হচ্ছে- ধারা-১৬তে অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা-বাহিনীর গোয়েন্দা বা অনুরূপ নজরদারি সংস্থার সদস্য হলে, তাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্রমতো, কমিশনের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না- এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে, ধারা-২০ এ ২০০৯ সালের আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার হবহু প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে শৃঙ্খলা বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্ত করা এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়েছে।
বিবৃতিতে টিআইবি বলছে, খসড়া আইনে কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে কমিশনার হিসেবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও নারীদের অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। এক্ষেত্রে টিআইবি’র সুপারিশ হচ্ছে ধারা ৫(৩)-এ কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারগণ নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে একজন ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে, কমপক্ষে দুইজন নারী কমিশনার রাখার সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করতে হবে। উপধারা-৬(৩) (গ) এ একজন সরকারি কর্মচারীকে স্বীয়পদে চাকরিরত অবস্থায় ছুটি নিয়ে কমিশনার হিসেবে নিয়োগের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে, যা স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত ও নিরপেক্ষভাবে কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্তরায়। এই বিধানটি বাতিল করতে হবে। একইসঙ্গে, কমিশনার নিয়োগে যোগ্যতা হিসেবে ‘পেশাগত জীবনে দলনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার রক্ষা, সততা ও শুদ্ধাচার পালনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ করতে হবে- এমন ধারা যুক্ত করতে হবে।
