কোনো প্রাণী বেছে নিচ্ছে পছন্দের দেশের পতাকাবাহী খাবার, কেউ আবার বল ঠেলে দিচ্ছে গোলপোস্টের দিকে- এভাবেই তারা বলে দিচ্ছে বিশ্বকাপের জয়-পরাজয়ের আগাম বার্তা। যাদের কথা বলছি, তারা কোনো জ্যোতিষী নন, বিশ্বের অদ্ভুত ‘ভবিষ্যদ্বক্তা’ প্রাণী। ২০১০ সালে ‘পল দ্য অক্টোপাস’ থেকে শুরু করে ফারাহ দ্য ফ্যালকন; টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তারা আলোচনায় ছিল। এ প্রাণীদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কেন তাকিয়ে থাকে বিশ্ব? ফুটবলের ফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বানী করা ১৫ প্রাণীর আজব সব কাণ্ডকারখানা নিয়ে এই প্রতিবেদন-
১. দ্য পল (অক্টোপাস): ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে অক্টোপাস পল ব্যাপক খ্যাতি পায়। জার্মানির ওভারহাউসেনের সি লাইফ সেন্টার এর বাসিন্দা পল জার্মানির ম্যাচগুলোর সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করে খবরের শিরোনামে উঠে আসে। সেমিফাইনালে জার্মানি পরাজিত হওয়ার পর, ২০১০ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে স্পেনের জয়ের ভবিষ্যদ্বাণীও সে সঠিকভাবে করেছিল। ২০০৮ সালের ইউরো ২০১০ বিশ্বকাপ মিলে মোট ১৪ ভবিষৎদ্বাণীর ১২টি সঠিক সিদ্ধান্ত দেয় অক্টোপাসটি। মূলত দু’টি স্বচ্ছ বাক্সের মধ্যে একটি বেছে নিয়ে ম্যাচ জয়ী নির্ধারণ করতো পল। প্রতিটি বাক্সে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের পতাকা লাগানো থাকতো। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরেই ২০১০ সালের অক্টোবরে পল মারা যায়। তাকে তার আবাসস্থল সি লাইফ সেন্টারের আঙিনায় সমাহিত করা হয় এবং তার স্মরণে সেখানে একটি ছোট স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়।
২. নেলি দ্য এলিফ্যান্ট (হাতি): জার্মানির সেরেঙ্গেটি পার্কের নেলি দ্য এলিফ্যান্ট তার ফুটবল দক্ষতা এবং ম্যাচের ফলাফল অনুমান করার ক্ষমতার জন্য পরিচিতি পায়। সে অংশগ্রহণকারী দলের পতাকাবাহী দু’টি নেটের একটিতে বল লাথি মেরে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতো। ২০০৬, ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১২ ইউরো মিলে মোট ৩৩ ম্যাচে অনুমান করে ৩০টি সঠিক সিদ্ধান্ত জানায় নেলি। এখনো হাতিটি জীবিত আছে। উত্তর জার্মানির সেরেঙ্গেটি পার্কে তার বাড়ির আঙিনায় প্রায়ই ফুটবল খেলে।
৩. সিটজে দ্য কাউ (গরু): ভবিষ্যদ্বাণী করা আরেকটি প্রাণী সিটজে দ্য কাউ। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে কোস্টারিকার বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের জয় সে সঠিকভাবে অনুমান করেছিল। ভবিষ্যৎদ্বাণীর অংশ হিসেবে গরুটি নেদারল্যান্ডসের পতাকাবাহী খাবারের বালতি বেছে নিয়েছিল। সেই ম্যাচে কোস্টারিকাকে হারায় ডাচ্রা।
৪. কাবেসাও দ্য টার্টল (কচ্ছপ): ব্রাজিলের প্রাইয়া ডো ফোর্টে-এর বাসিন্দা কাবেসাও (যার অর্থ ‘বড় মাথা’) ২০১৪ বিশ্বকাপে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। তার প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী ছিল ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়। এটি ছিল স্বাগতিক ব্রাজিলের উদ্বোধনী ম্যাচ। অংশগ্রহণকারী দেশের পতাকার নিচে থাকা মাছের কোনটি সে খাবে, তা বেছে নিয়েই সে নিজের রায় জানাতো। ড্র বোঝাতে একটি বলের সাথে তৃতীয় একটি মাছ ঝুলিয়ে রাখা হতো। বর্তমানে ব্রাজিলের প্রাইয়া ডো ফোর্টে অভয়াশ্রমে কচ্ছপটি রয়েছে।
৫. শাহিন দ্য ক্যামেল (উট): ২০১৪ সালে ‘গালফ নিউজ’ দুবাইয়ের শাহিন দ্য ক্যামেলকে নিয়ে একটি ভিডিও সিরিজ তৈরি করে। সেখানে এই উট বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর ফলাফল আগেভাগে জানাতো। তার সামনে দু’টি দেশের পতাকা দেয়া চিহ্ন রাখা হতো। বিজয়ী দল হিসেবে যেটিকে সে মনে করতো, সেই চিহ্নের পেছনে কামড় দিয়ে সে তার সিদ্ধান্ত জানাতো।
৬. আওচান দ্য পেঙ্গুইন: টোকিওর শিনাগাওয়া অ্যাকুয়া স্টেডিয়ামের আওচান দ্য পেঙ্গুইন ২০১৪ ফিফা বিশ্বকাপে জাপানের উদ্বোধনী ম্যাচের ফলাফল অনুমান করে। আওচান তার ঠোঁট ব্যবহার করে বিভিন্ন ফলাফলের একটি চাকা ঘুরিয়ে ম্যাচটি ড্র হবে বলে জানায়। তবে ম্যাচটিতে আইভরি কোস্ট ২-১ গোলে জাপানকে হারায়।
৭. আর্চারফিশ: ২০১৪ সালে জাপান বনাম আইভরি কোস্ট ম্যাচের ফলাফল অনুমানের দায়িত্ব দেয়া হয় একদল আর্চারফিশকে। মাছগুলোকে ট্যাঙ্কের দু’পাশে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হয়। একুরিয়ামের ভেতরে দুই দেশের পতাকা লাগানো হয়। তাদের সমান পরিমাণ খাবার দেয়া হয় এবং যে দলের মাছ আগে খাবার শেষ করতো তাদের বিজয়ী ভাবা হয়। জাপানি পতাকার দিকের মাছেরা আগে খাবার শেষ করে। কিন্তু এই অনুমান সঠিক হয়নি।
৮. নরম্যান দ্য আর্মাডিলো: জার্মানির মুনস্টারের একটি স্থানীয় চিড়িয়াখানার নরম্যান দ্য আর্মাডিলো টুর্নামেন্টের লোগোযুক্ত বল থেকে একটি বেছে নিতো। পর্তুগালের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে সে জার্মানিকে বিজয়ী হিসেবে বেছে নেয় এবং জার্মানি ৪-০ ব্যবধানে জয়ী হয়।
৯. খান দ্য হোয়াইট বেঙ্গল টাইগার: রাশিয়ার রোয়েভ রুচে চিড়িয়াখানার খান নামের বাঘটি রাশিয়া বনাম আলজেরিয়া ম্যাচের জয়ী অনুমান করার চেষ্টা করে। সে দু’টি ফুটবল বলের একটি বেছে নেয়। অনুমান হিসেবে টাইগারটি রাশিয়ার বল বেছে নিলেও ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়।
১০. ইইং মেই দ্য জায়ান্ট পান্ডা: চীনের জিয়াংসু প্রদেশের ইইং মেই নামের পান্ডাটির সামনে ব্রাজিল ও ক্রোয়েশিয়ার পতাকাবাহী তিনটি খাবারের বাক্স রাখা হয়। সে ব্রাজিলের বাক্সটি বেছে নেয়। ২০১৪ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ব্রাজিল ৩-১ গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারায়।
১১. চিপ্পু দ্য অটার (উদবিড়াল): জাপানের হিমিজি সেন্ট্রাল পার্কের চিপ্পু ২০১৪ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশের পতাকাবাহী খেলনা বল বেছে নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতো। জাপান বনাম গ্রিস ম্যাচের ফলাফলের ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে গ্রিসকে বেছে নেয়, কিন্তু ম্যাচটি ড্র হয়।
১২. মাদাম শিভা দ্য গিনিপিগ: সুইজারল্যান্ডের মাদাম শিভা নামের গিনিপিগটিকে একটি ছোট ফুটবল মাঠে রাখা হয়, যার এক প্রান্তে সুইজারল্যান্ড এবং অন্য প্রান্তে ইকুয়েডরের রঙ ছিল। সে মাঠে নামার সাথে সাথে সুইজারল্যান্ডের দিকে দৌড়ে যায় এবং সেখানে মলত্যাগ করে নিজের জয়ী নির্বাচন নিশ্চিত করে। সুইজারল্যান্ড ২-১ গোলে জয়ী হওয়ায় তার ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক ছিল।
১৩. জাবিয়াকা দ্য গোট (ছাগল): রাশিয়ার সামারা চিড়িয়াখানার জাবিয়াকা ছাগলটি সঠিক ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিল। কিন্তু ২০১৮ বিশ্বকাপের জয়ী হিসেবে সে বেলজিয়ামের পতাকাবাহী খাবারের পাত্র বেছে নেয়। অথচ সেই বছর ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতে।
১৪. অ্যাকিলিস দ্য ক্যাট (বিড়াল): রাশিয়ার শ্রবণপ্রতিবন্ধী অ্যাকিলিস বিড়ালটি সেন্ট পিটার্সবার্গের হারমিটেজ মিউজিয়ামে থাকে। ২০১৮ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে রাশিয়ার জয় সে সফলভাবে অনুমান করেছিল।
১৫. ফারাহ দ্য ফ্যালকন (বাজপাখি): ২০১৮ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪টি আরব দেশ (মরক্কো, তিউনিসিয়া, সৌদি আরব এবং মিশর) অংশগ্রহণ করায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফারাহ দ্য ফ্যালকনকে ম্যাচের ফলাফল অনুমানের দায়িত্ব দেয়া হয়। তার সামনে দু’টি কাঠের পতাকা রাখা হতো এবং সে উড়ন্ত অবস্থায় বিজয়ী দলের পতাকার ওপর বসে পড়তো।
