যেখানে প্রবাসীর বাড়ি নিরাপদ নয়, সেখানে রবিন খুদার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আসবে কীভাবে?

যেখানে প্রবাসীর বাড়ি নিরাপদ নয়, সেখানে রবিন খুদার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আসবে কীভাবে?

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা অবকাঠামো এখন নতুন শিল্প বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু। যে দেশ এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে, আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব অনেকটাই তার হাতেই থাকবে। এমন এক সময়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তা রবিন খুদার প্রতিষ্ঠান এয়ারট্রাঙ্ক ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঁচ গিগাওয়াট সক্ষমতার ডেটা সেন্টার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার এই উদ্যোগ শুধু একটি ব্যবসায়িক বিনিয়োগ নয়; এটি একটি দেশের প্রতি আস্থার প্রকাশ।

প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকায় জন্ম নেওয়া, বাংলাদেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা একজন উদ্যোক্তা কেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগগুলোর একটি নিজের জন্মভূমিতে নয়, ভারতে করছেন?

এর উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। রবিন খুদার জন্ম ঢাকায়। শের-ই-বাংলা নগর সরকারি বয়েজ স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। আজ তিনি বিশ্বের অন্যতম সফল প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের একজন। তার প্রতিষ্ঠানের কয়েক লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে চূড়ান্ত হয়। মোদি এই বিনিয়োগকে ভারতের জন্য কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন দিগন্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এখানে মূল বিষয়টি শুধু অর্থের অঙ্ক নয়। মূল বিষয় হচ্ছে—ভারত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে, যেখানে একজন আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নিরাপত্তা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ কি সেই নিশ্চয়তা দিতে পেরেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সামনে একের পর এক উদ্বেগজনক ঘটনা এসে দাঁড়ায়।

ফ্রান্সপ্রবাসী বাংলাদেশি আবদুল্লাহ আল বাকীর ঘটনাটি তার একটি প্রতীকী উদাহরণ। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি দেশে সম্পদ গড়েছেন। রাজধানীর দক্ষিণখানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে এক স্থানীয় ব্যক্তি তার বাড়ি দখল করে রেখেছেন, ভাড়া উত্তোলন করছেন এবং মালামাল লুটপাট করেছেন।

ফ্রান্স প্রবাসী সিনিয়র সিটিজেন আবদুল্লাহ আল বাকী অভিযোগ করেছেন যে, দক্ষিণখান থানার দক্ষিণ গাওয়াইর ৪২১/এ নম্বর বাড়িতে আবদুল্লাহ আল বাকীর নির্মাণাধীন ছয়তলা ভবন (যার চারতলার কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে) অবস্থিত। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেশী ৪২১ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা ফখরুল হাসানের নেতৃত্বে একটি চক্র এর আগেও একবার বাড়িটি দখল করেছিল। পরে আইনজীবী ও দক্ষিণখান থানা পুলিশের হস্তক্ষেপে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর ফখরুল হাসানকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তিনি মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পান। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুনরায় আবদুল্লাহ আল বাকীর বাড়িটি দখল করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই লেখা পর্যন্ত ভবনটি তাদের দখলে রয়েছে এবং সেখান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী। তিনি জানান, ১৯৮৯ সালে ফ্রান্সে পাড়ি জমান এবং ১৯৯৯ সালে দক্ষিণখানে জমি কিনে ২০০৯ সালে ভবন নির্মাণ শুরু করেন।
প্রবাসীদের প্রশ্ন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি দখল ও লুটপাটের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তবে সে দলের সম্পদ নয়, বরং বোঝা। এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তিনি প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন, রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গিয়েছেন, বিভিন্ন পর্যায়ে আবেদন করেছেন; কিন্তু সমস্যার কার্যকর সমাধান পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

সম্প্রতি তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখিত আবেদন করেছেন।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, একজন প্রবাসীর নিজের বাড়ির নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে একজন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী তার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত মনে করবেন?

বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা শুধু রেমিটেন্স পাঠান না। তারা বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রদূত। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবসা করেন, বিনিয়োগ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে দেশে বিনিয়োগ করতে গেলে নানা ধরনের হয়রানি, দখলবাজি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি হতে হয়। এই বাস্তবতা নতুন নয়।

বিগত কয়েক দশকে অসংখ্য প্রবাসী উদ্যোক্তা শিল্প স্থাপন, আবাসন প্রকল্প, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছেন। কারণ তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মূলধন নয়, আস্থার সংকট।

অর্থনীতির ভাষায় বিনিয়োগ মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একজন বিনিয়োগকারী কখনও শুধু করছাড় বা জমি দেখে বিনিয়োগ করেন না। তিনি দেখেন, আইনের শাসন কতটা কার্যকর, সম্পত্তির অধিকার কতটা সুরক্ষিত, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল।

বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর সন্তোষজনক উত্তর এখনও আমরা দিতে পারিনি।
সম্প্রতি গ্রিসপ্রবাসী জাহিদ ইসলামের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। তার অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা তার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা ও নিয়মিত মাসোহারা দাবি করেছেন। এমন অভিযোগের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে ব্যক্তি নয়, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনো প্রবাসী অনুভব করেন যে দেশে ফিরে তিনি নিরাপদ নন, তার সম্পদ নিরাপদ নয়, এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও নির্বিঘ্নে দেখা করতে পারবেন না, তখন তিনি বিনিয়োগের চিন্তা করবেন কেন?

একজন উদ্যোক্তা ঝুঁকি নেন ব্যবসায়। কিন্তু তিনি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব বা প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকি নিতে চান না।

ভারত কিংবা ভিয়েতনাম আজ বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে শুধু বাজারের আকারের কারণে নয়; তারা বিনিয়োগকারীদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে পেরেছে, আপনার বিনিয়োগ নিরাপদ। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমরা এখনও অনেক ক্ষেত্রে সেই বার্তা দিতে পারিনি। অবশ্যই সবকিছু অন্ধকার নয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের প্রথম কয়েক মাসে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। প্রবাসীদের জন্য রেমিটেন্স কার্ড চালুর উদ্যোগ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ঘোষণা এবং অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের বিভিন্ন পদক্ষেপ আশার সঞ্চার করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বারবার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, একটি সরকারের সদিচ্ছা তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর হয়।
যদি স্থানীয় পর্যায়ে দখলবাজ, চাঁদাবাজ ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে থাকে, তাহলে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এখানেই রাজনৈতিক দলগুলোর বড় দায়িত্ব রয়েছে। যে ব্যক্তি দলের নাম ব্যবহার করে প্রবাসীর বাড়ি দখল করে, চাঁদা দাবি করে বা প্রভাব খাটিয়ে অন্যায় সুবিধা নেয়, সে কোনো দলের সম্পদ নয়; সে বোঝা। সে শুধু একজন ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, পুরো দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশির কাছে এসব ঘটনা দ্রুত পৌঁছে যায়। তারা দেখেন, বিশ্লেষণ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন। এরপর যখন বিনিয়োগের সুযোগ আসে, তখন তারা আবেগের চেয়ে বাস্তবতাকেই বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে বাংলাদেশ হারায় সম্ভাব্য বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সুযোগ।
রবিন খুদার ভারত বিনিয়োগের খবর তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সংবাদ নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি আয়না। এই আয়নায় আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কোথায়।
আমরা কি পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করতে পেরেছি? আমরা কি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পেরেছি?

আমরা কি বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের কাছে এই বার্তা দিতে পেরেছি যে তাদের সম্পদ ও বিনিয়োগ রাষ্ট্র সুরক্ষা দেবে? আমরা কি এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়তে পেরেছি যেখানে একজন উদ্যোক্তাকে ফাইল নিয়ে মাসের পর মাস ঘুরতে হবে না?

সব প্রশ্নের উত্তর যদি ইতিবাচক হতো, তাহলে হয়তো আজ রবিন খুদার বিনিয়োগের একটি অংশ হলেও বাংলাদেশের মাটিতে আসত। অনেকে যুক্তি দেবেন, এত বড় ডেটা সেন্টার প্রকল্পের জন্য ভারতের মতো বিশাল বাজার প্রয়োজন। যুক্তিটি আংশিক সত্য। কিন্তু পুরো সত্য নয়। কারণ বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই ছোট বাজারেও বিনিয়োগ করেন, যদি তারা স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা দেখতে পান।

সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা আয়ারল্যান্ডের বাজার ভারতের তুলনায় অনেক ছোট। তবুও তারা বৈশ্বিক বিনিয়োগের বড় গন্তব্য। কারণ তারা আস্থা তৈরি করতে পেরেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অর্থের অভাব নয়; আস্থার ঘাটতি। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে।

প্রবাসীরা শুধু রেমিটেন্স পাঠানোর মেশিন নন। তারা বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের অংশ। তাদের সম্পদ, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন।

রবিন খুদা ভারতে ৪ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন, এটি ভারতের সাফল্যের গল্প। কিন্তু একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তাও। প্রশ্নটি তাই রবিন খুদাকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, যেখানে পরবর্তী রবিন খুদা নিজের জন্মভূমিতে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন?

যেদিন এই প্রশ্নের উত্তর দৃঢ়ভাবে “হ্যাঁ” হবে, সেদিন বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের পুঁজি, অভিজ্ঞতা এবং আস্থা আবার দেশের দিকে ফিরে আসবে। আর সেদিনই হয়তো আমরা শুনব, কোনো বাংলাদেশি উদ্যোক্তা শুধু ভারতের নয়, বাংলাদেশের মাটিতেও কয়েক লাখ কোটি টাকার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন