ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ড সফর শেষে দেশে ফিরেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত শুক্রবার দেশে ফেরেন তিনি। এরপর গতকাল রোববার রাজধানীর মিরপুরে নিজ কার্যালয়ে যোগ দেন। ইউনূস সেন্টার থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গত ২৭ মে প্যারিসের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন প্রফেসর ইউনূস। প্যারিস থেকে অ্যামস্টারডাম পৌঁছেন গত ৩১ মে। এই সফরে সামাজিক ব্যবসা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও যুব উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা নিয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন প্রফেসর ইউনূস।
প্যারিসে ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক নৈশভোজে অংশ নেন প্রফেসর ইউনূস। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এরিক ভিয়াল, যিনি ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল গ্রুপের চেয়ারম্যান।
এ ছাড়া, ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ফেডারেশনে অনুষ্ঠিত গ্রামীণ ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ফাউন্ডেশন (জিসিএএফ)-এর ঐতিহাসিক ৫০তম বোর্ড সভায় অংশ নেন প্রফেসর ইউনূস।
এছাড়া গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকোল ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক সংলাপেও অংশ নেন প্রফেসর ইউনূস। এই সংলাপে নারী-পুরুষের সমতা ও বৈষম্যবিরোধী লড়াই বিষয়ক ফরাসি মন্ত্রী অরোরে বের্জে উপস্থিত ছিলেন। ফোরামে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং লিঙ্গ সমতাখাতের ১৫০ জন নেতৃবৃন্দও অংশগ্রহণ করেন।
এই সংলাপে ফরাসি মন্ত্রী অরোর বের্জে ফাউন্ডেশনটির কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক ঋণ কার্যক্রমের ৮৫ শতাংশেরও বেশি নারীদের কাছে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সসহ বিশ্বজুড়ে বৈষম্য ও অসমতা এখনো একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। তাই তরুণ সমাজের, বিশেষ করে নারীদের ক্ষমতায়ন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।’
আলোচনায় প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী—তরুণ-তরুণী উভয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণে সংঘটিত এই গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে যে, একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও সমতাপূর্ণ সমাজ গঠনে তৃণমূল পর্যায়ে আর্থিক ক্ষমতায়ন ও স্বনির্ভরতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের তরুণীরা সম্মুখসারীতে থেকে এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে।’
নতুন প্রযুক্তির শক্তিতে বলীয়ান তরুণ-তরুণীরা আগামী দিনে নিজেদের জন্য বিপুল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করবে বলে জানান তিনি। গত ২৯ মে প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক সিটি হল ভবনে নবনির্বাচিত প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ারের সঙ্গে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে ফ্রান্স, বিশেষ করে প্যারিসে সামাজিক ব্যবসার বিভিন্ন সম্ভাবনা ও উদ্যোগ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। এসময় বৈশ্বিক সামাজিক ব্যবসা আন্দোলনে ফ্রান্স, বিশেষ করে প্যারিসের অবদান আলোচনায় উঠে আসে। এ সময় সাবেক দুই মেয়াদে প্যারিসের মেয়র অ্যান ইদালগোর বিশেষ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন প্রফেসর ইউনূস। তার উদ্যোগেই প্যারিসের একটি ঐতিহাসিক ভবনকে সংস্কার করে সামাজিক ব্যবসা ও সামাজিক উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে ‘লে কানো’ (Les Canaux) প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বৈঠকে প্রফেসর ইউনূস ও মেয়র গ্রেগোয়ার ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ে তোলার ধারণা এবং এ লক্ষ্যে তরুণদের নেতৃত্বে থ্রি জিরো ক্লাব গঠনের বিষয়েও আলোচনা করেন। মেয়র গ্রেগোয়ার প্যারিসে একটি ‘সামাজিক ব্যবসা দিবস’ চালুর বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য শহরেও এ উদ্যোগ ছড়িয়ে দিয়ে এটিকে একটি বৈশ্বিক দিবসে পরিণত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এরপর গত ৩০ মে নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামে প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের স্থানীয় সরকার ও এনজিও নেতারা। বৈঠকে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি শহরে প্রফেসর ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা মডেল চালুর লক্ষ্যে একটি নতুন উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন নেপলসের ফোকাস ফাউন্ডেশনের সভাপতি রাচেল ফুরফারো, ফাউন্ডেশনটির পরিচালক রেনাটো কোয়াগ্লিয়া, সিটি অব পিস ফর চিলড্রেন বাসিলিকাটা ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এনজো কারসিও এবং নির্বাহী পরিচালক ভ্যালেরিও জামবেরসি। এছাড়া প্রতিনিধিদলে ছিলেন সিসিলির আঞ্চলিক পার্লামেন্টের সদস্য, সিলভিও বেরলুসকোনি সরকারের সাবেক মন্ত্রী জানফ্রাঙ্কো মিচিকে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে নেপলস, পোটেঞ্জা ও পালের্মো শহরে নগর পুনরুজ্জীবন এবং টেকসই স্থানীয় উন্নয়নে প্রফেসর ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার নীতিমালা প্রয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকে প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘এই উদ্যোগটি সামাজিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে নগর-চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি নতুন দৃষ্টান্ত। প্রকল্পটি শুরু থেকেই এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে এটি একটি পুনরাবৃত্তিযোগ্য (রেপ্লিকেবল) মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে; যে মডেলটি অন্যান্য শহর ও অঞ্চল নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ, পরিমার্জন ও সম্প্রসারিত করতে পারবে।’
গত ১ জুন নেদারল্যান্ডসের বৃহত্তম দাতব্য প্রতিষ্ঠান ডাচ পোস্টকোড লটারির আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। এ অনুষ্ঠানে ৮৫০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন। ডাচ পোস্টকোড লটারি নেদারল্যান্ডসের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ফান্ডরেইজিং লটারি, যা সমাজ, পরিবেশ এবং মানবিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা বিস্তৃত দাতব্য সংস্থাগুলোতে এর আয় থেকে অর্থায়ন করে। “The Power of Postcodes” হলো এর বার্ষিক আয়োজন, যেখানে অংশীদার, নীতিনির্ধারক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একত্র করে সম্মিলিত প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ হয়।
প্রফেসর ইউনূস তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের এই পৃথিবী মহাকাশে ভ্রমণরত একটি মহাকাশযানের মতো। আমরা যারা এতে আছি, তারা নিজেদের যাত্রী মনে করি। সবাই ইকোনমি ক্লাস থেকে বিজনেস ক্লাসে, বিজনেস ক্লাস থেকে ফার্স্ট ক্লাসে যেতে চাই—নিজ নিজ যাত্রাকে আরও আরামদায়ক করার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে আমরা কেবল যাত্রী নই, আমরা এই মহাকাশযানের চালকও। এই যানের গন্তব্য নির্ধারণ করা এবং সেখানে পৌঁছানোর পথ তৈরি করা আমাদেরই দায়িত্ব।’
বক্তব্যে প্রফেসর ইউনূস তার ‘তিন শূন্যের বিশ্ব’ (Three Zeros) ধারণা তুলে ধরেন—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণ এবং শূন্য বেকারত্ব। তিনি বলেন, ‘এই লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের নেতৃত্বে কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন জরুরি।’ বক্তব্যে বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কথা তুলে ধরেন তিনি।
এ সফরে প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে ছিলেন গ্রামীণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হাসান, ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ ও ওয়াই ওয়াই ভেঞ্চার্সের প্রতিষ্ঠাতা সজীব এম খায়রুল ইসলাম।

Binsuwaidi
১ ঘন্টা আগেযে সমস্ত টকশাওয়ালা বলেছিল ইউনুস পালিয়েছে এখন তাদের রিপ্লাই টা কি হবে