দ্রুত বিচারের রেকর্ড

১৯ দিনে রামিসা ধর্ষণ-হত্যার রায়, সোহেল-স্বপ্না দম্পতির মৃত্যুদণ্ড

দ্রুত বিচারের রেকর্ড

ফন্ট সাইজ:

রামিসা হত্যাকাণ্ড। ঘটনার ৭২ ঘণ্টার মাথায় ডিএনএ ও সুরতহাল রিপোর্ট জমা। চারদিনের মাথায় অভিযোগপত্র 
দাখিল। দুইদিনে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ। ৫ কার্যদিবসের মধ্যে পুরো বিচার প্রক্রিয়া শেষে রায় ঘোষণা। দেশের ইতিহাসে দ্রুত বিচারের রেকর্ড গড়লো আলোচিত এই মামলা। শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ে আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত। নজিরবিহীন এ রায়ের মধ্যে দিয়ে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দ্রুত সময়ে হত্যা মামলার বিচার শেষ করার দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো। একইসঙ্গে আসামিদের ৭ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়, অর্থদণ্ডের সাত লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিহত রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন। আসামিরা অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ওই টাকা ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষ, আসামির আইনজীবী ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির নেতারা প্রতিক্রিয়া দেন। মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তিকে বিচার বিভাগের জন্য একটি মাইলফলক বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নিহত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন আগামী তিন মাসের মধ্যে বাকি বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিচার ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে পুরো দেশ স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। রায়ের পর্যবেক্ষণেও আবেগঘন বক্তব্য উঠে এসেছে। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, এই মামলা কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়।

এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। বিচারক বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কোনো শিশু যখন যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, একটি ন্যায়সঙ্গত বিচার শুধু আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন, ডিফেন্স, সাক্ষী এবং বিচার ব্যবস্থার সব অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ন্যায়বিচারের লক্ষ্য অর্জিত হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং মামলার সার্বিক পরিস্থিতি বিচারিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে পর্যালোচনা করেই আদালত এ রায় দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।

রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আইনজীবী এডভোকেট মুসা আলিমুল্লাহ বলেন, আদালতে সোহেল কোনো সাফাই সাক্ষী উপস্থাপন করেনি। সে নিজেই আত্মস্বীকৃত অপরাধী। ফলে আদালত যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সেটিকে আমি ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবেই দেখি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এ ধরনের আলোচিত মামলার বিচার নিষ্পত্তির নজির আমার জানা নেই। এই রায়ের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা গেছে, অপরাধী অপরাধ করলে সে কোনোভাবেই নিস্তার পাবে না।

এদিকে রায় ঘোষণার পর আদালতের এজলাসকক্ষে আসামি সোহেল ও স্বপ্না দু’জনই নীরব ছিলেন। কাঠগড়া থেকে বের করার সময়ও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। তবে রায় পড়ার আগে কাঁদতে থাকেন স্বপ্না। আর সোহেলকে বিড়বিড় করে কিছু পড়তে দেখা যায়। রায় ঘোষণার পর দুপুর ১২টার দিকে সোহেল ও স্বপ্নাকে কাঠগড়া থেকে বের করার সময় ‘খুনি খুনি’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন বিক্ষুব্ধ জনতা। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের ফাঁসি কার্যকরের দাবি জানান উপস্থিত সাধারণ মানুষ।

গতকাল সকাল ১১টার দিকে বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। এদিন সকালে দুই আসামিকে কারাগার থেকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে আনা হয়। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে ও স্বপ্না আক্তারকে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে মহানগর আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। এদিকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে আদালত এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। আদালতের প্রবেশপথ ও আশপাশের সড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া মেয়ে হত্যার রায় শুনতে সকালেই আদালতে আসেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। রায় ঘিরে উৎসুক মানুষের ভিড়ও লক্ষ্য করা যায়।

এর আগে বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্ক শেষে রোববার রায়ের দিন ধার্য করেন আদালত। সেদিন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানান, সোহেল রানার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে শক্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। একইসঙ্গে স্বপ্না খাতুনও অপরাধ সংঘটন ও পরবর্তী কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছেন বলে আদালতে দাবি করা হয়। এর আগে গত ১৯শে মে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটে মে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। ওই দিন সকালে বাসা থেকে বের হওয়া মাত্র পাশের বাসার বাসিন্দা সোহেল রানা রামিসাকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরে তার শরীর থেকে মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। পরদিন শিশুটির বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেন। মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা এবং লাশ গোপনের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের আটক করে আদালতে তোলে। হত্যার পরদিন সন্ধ্যায় নিহত রামিসার বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুত সময়ের মধ্যে রামিসা হত্যার বিচার শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়। দ্রুত বিচার শেষ করতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সবধরনের সহায়তাও করা হয়।

অন্য যেসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়: আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ২০২০ সালে রংপুরের একটি ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুততার সঙ্গে শেষ হয়। ঘটনা থেকে রায় পর্যন্ত সময় লাগে ৬৬ দিন। তবে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের পর বিচারিক কার্যক্রম মাত্র দু’টি কার্যদিবসে সম্পন্ন হওয়ায় মামলাটি দ্রুত বিচারের উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। ওই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে না পারায় প্রধান আসামি খালাস পান। এ ছাড়া মাগুরায় আট বছর বয়সী শিশু ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। এই মামলাটিও দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।

ঘটনা থেকে রায় পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ৭২ দিন এবং বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয় ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে। দ্রুত বিচারের উদাহরণগুলোর মধ্যে আলোচিত ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা। ২০১৯ সালের ৬ই এপ্রিল সোনাগাজীতে নুসরাতকে গায়ে আগুন দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ১০ই এপ্রিল ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একইদিন হত্যা মামলা করা হয়। ঘটনা থেকে বিচারের রায় পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় সাড়ে ছয় মাস। এই মামলায় ৬২ কার্যদিবসে বিচার শেষ হওয়াকে দেশের বিচারিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখা হয়।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন