দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় ক্ষেত্র হলো আবাসন বা রিয়েল অ্যাস্টেট খাত। তবে গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নির্মাণসামগ্রীর আকাশচুম্বী দাম এবং উচ্চ নিবন্ধন ব্যয়ের কারণে এই খাতটি বড় ধরনের মন্দার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে কেন্দ্র করে এই স্থবিরতা কাটানোর জন্য একটি বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী নীতিমালার দাবি উঠেছে সব মহল থেকে। সম্প্রতি আসন্ন বাজেটের রূপরেখা এবং আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম।
বাংলাদেশের আবাসন খাতের কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। তিনি নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও টেকসই আবাসন নীতিমালার আলোকে আসন্ন বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, আবাসন খাতকে সচল করতে প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে কাজ করছি। আসন্ন বাজেটে আমাদের মূল লক্ষ্য হবে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন নিশ্চিত করা। শুধু উচ্চবিত্তদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট তৈরি করলেই আবাসন খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি বিশেষ রি-ফাইন্যান্সিং বা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা এবং সিঙ্গেল ডিজিট সুদে (৯ শতাংশের নিচে) ২৫ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ সুবিধা চালু করা আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা এনবিআর-এর সঙ্গেও কথা বলছি যেন নির্মাণসামগ্রী, বিশেষ করে রড, সিমেন্ট ও ইটের ওপর শুল্ক কাঠামো কিছুটা শিথিল করা যায়, যাতে উৎপাদন খরচ কমে আসে।
বর্তমানে বাংলাদেশে একটি ফ্ল্যাট বা জমি নিবন্ধনের সময় গেইন ট্যাক্স, স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর এবং মূসক (ভ্যাট) মিলিয়ে প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত খরচ গুনতে হয় ক্রেতাকে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ, এমনকি উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এই হার অত্যন্ত বেশি। ফলে অনেক ক্রেতাই ফ্ল্যাট কিনেও আইনি জটিলতার ভয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে বিলম্ব করেন, যা সরকারের রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ বিষয়ে অর্থনীতি ও নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএসইআর-এর চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম তার বিশ্লেষণে বলেন, নিবন্ধন খরচ কমানোর দাবি কেবল রিয়েল অ্যাস্টেট ব্যবসায়ীদের স্বার্থে নয়, এটি সাধারণ ক্রেতা এবং স্বয়ং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির স্বার্থেই অত্যন্ত যৌক্তিক। উচ্চ কর হারের কারণে ক্রেতারা অপ্রদর্শিত বা ইনফরমাল চ্যানেলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আমরা যদি এই খরচ কমিয়ে মোট ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে পারি, তবে ফ্ল্যাট কেনাবেচার সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যদি এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, তবে আবাসন খাতে আটকে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপিটাল বা মূলধন সচল হবে।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বাজেটের ভূমিকার কথা তুলে ধরে বলেন, ঢাকার ওপর জনসংখ্যা ও আবাসনের যে প্রচণ্ড চাপ, তা কমাতে হলে আমাদের দ্রুত বিকেন্দ্রীকরণ ও স্যাটেলাইট টাউন ধারণায় যেতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজউকের আওতাধীন পূর্বাচল নতুন শহর এবং ঝিলমিল প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর নাগরিক সুবিধা দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এ ছাড়া, ভবন নির্মাণ বিধিমালা বা ড্যাপ বাস্তবায়নে আমরা কঠোর হচ্ছি। নতুন রাজউক অর্ডিন্যান্সের আওতায় নকশা বহির্ভূত বা অবৈধ ভবনের জরিমানার অর্থ সরাসরি নগর উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধিতে ব্যয় করা হবে।
