দেশে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে তামাক কর কাঠামোর দুর্বলতা

দেশে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে তামাক কর কাঠামোর দুর্বলতা

ফন্ট সাইজ:

আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড মোড়ে নিজের রিকশা দাঁড় করিয়ে সিগারেট টানছেন এক রিকশাচালক। আর ধোঁয়া ছাড়ছিলেন আকাশের দিকে। যাত্রী হিসেবে জানতে চাইলাম যাবেন কাওরান বাজার মোড়? উত্তরে বললেন, যাবো। সিগারেটটা শেষ করে নেই। তারপর ভাড়ার চুক্তি চুটিয়ে রিকশায় উঠার পর পথ চলতে চলতে জানতে চাইলাম, দিনে কয়টি সিগারেট টানেন। ওই চালক বললেন দিনে ১০টা। প্রতিবেদক একথা শুনেই অবাক হয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এত সিগারেট! চালক জানান, ভাই দাম কম। তাই বেশি করে খাই।

দেশে কম দামই সিগারেটকে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তুলেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এর বড় কারণ, দেশের তামাক কর কাঠামোর দুর্বলতা। এর সুযোগ নিচ্ছে তামাক কোম্পানিগুলো। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে সিগারেট এখনো তুলনামূলক সস্তা।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে দেশে বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়। এটি দেশে বছরে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশ। ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভাল্যুশনের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে মৃত্যুর প্রায় ৭৯ শতাংশ ঘটে প্রত্যক্ষ ধূমপানের কারণে। ‘ইকোনমিক কস্টস অব টোব্যাকো ইন বাংলাদেশ: অ্যান আপডেটেড এস্টিমেট ইনক্লুডিং হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ড্যামেজেস’ শীর্ষক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ভারতে এ হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ। বাংলাদেশে তামাক কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, সিগারেটে ইতিমধ্যেই অনেক বেশি কর রয়েছে। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, সমস্যা করের হারে নয়, সমস্যা কর কাঠামোয়।

বর্তমানে দেশে সিগারেটে চারটি মূল্যস্তর রয়েছে নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম। প্রতিটি স্তরে আলাদা দাম ও করহার। এই বহুস্তর কাঠামোর ফলে ভোক্তারা সহজেই এক স্তর থেকে আরেক স্তরে চলে যেতে পারেন। ফলে দাম বাড়লেও ধূমপান পুরোপুরি কমে না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য গবেষকেরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বের ১৬২টি দেশের মধ্যে কম দামি সিগারেটের সহজলভ্যতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। অর্থাৎ বাংলাদেশে সিগারেট এখনো তুলনামূলক সস্তা।

বাংলাদেশে যে সিগারেট সস্তা, সে কথা সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানও স্বীকার করেন। গত ২৭শে এপ্রিল এক প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, এত কম দামে আমাদের আশপাশের কোনো দেশে সিগারেট পাওয়া যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল তার এক উপস্থাপনায় দেখিয়েছেন, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে পরিবারপ্রতি আয় বেড়েছে ১০৩ শতাংশ, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে বিশেষ করে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম সেই হারে বাড়েনি। অধ্যাপক শাফিউন মানবজমিনকে বলেন, কার্যকর তামাক কর একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য রক্ষা, রাজস্ব বৃদ্ধি ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে সিগারেটের ওপর কর বাড়িয়ে তুললে রাজস্ব আয় কমতে কমতে অন্তত ৮ থেকে ১০ বছর লাগতে পারে। এর মধ্যে দেশের অনেক ভিন্ন আয়ের উৎস তৈরি হয়ে যাবে। কিন্তু তরুণেরা নিরুৎসাহিত হলে দেশের বিরাট একটি সম্পদ বাঁচবে।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তামাক কোম্পানিগুলো মূলত ভোক্তার কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে সরকারের কাছে জমা দেয়। যেমন বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) ২০২৪ সালে ৩৪ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা কর দিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ ছিল প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশই ভোক্তার দেয়া পরোক্ষ কর। অর্থাৎ সিগারেট কিনছেন যে মানুষ, কর মূলত তিনিই দিচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের এক গবেষণা বলছে, ২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে সিগারেটের অবৈধ বাণিজ্য সবচেয়ে কম মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। সে তুলনায় ভারতে এটি ১৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩৮ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৩৬ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, অবৈধ বাণিজ্য মূলত প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয়, কর বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।

তামাকবিরোধী সংগঠন ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের প্রস্তাব হলো নিম্ন ও মধ্যমস্তরের সিগারেট একত্র করে ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা করা, উচ্চস্তরের দাম ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের দাম ২০০ টাকা করা, প্রতি প্যাকেটে নির্দিষ্ট ৪ টাকা কর আরোপ, সব স্তরে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা। গবেষকদের দাবি, এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবেন, ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবেন, দীর্ঘ মেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।

দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মধ্যে। সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যেই ধূমপানের অভ্যাস শুরু হয় বলে জানান ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী। এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, তরুণ জনগোষ্ঠীকে ধূমপায়ী করে তোলার নানা আয়োজন আছে। কিন্তু সরকার তো ব্যবসা করার জন্য নয়। সরকার মানুষের সেবা করার জন্য। কিন্তু রাজস্বের অজুহাত দেখিয়ে রাষ্ট্রের মানুষের এমন স্বাস্থ্যগত ক্ষতি যেভাবে মেনে নেয়া হচ্ছে, তা কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন