দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সেদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের পুশইনের চেষ্টা করেছে। তবে গতকাল তাদের সবগুলো চেষ্টা-ই ব্যর্থ হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সতর্ক অবস্থানে থেকে এসব পুশইন ঠেকিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সীমান্তে স্থানীয়রাও বিজিবি’র সঙ্গে পুশইন ঠেকাতে সহায়তা করেছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সীমান্ত পরিস্থিতি উত্তেজনা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থানরত কিছু মানুষকে বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করে বারবার বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে বিএসএফ। এরপর থেকে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিস্তারিত স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টে-
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে জানান, গত ২-৩ দিন ধরে ভারতের পশ্চিম বাংলার সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় হোল্ডিং সেন্টারে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ২০-২৫ জনকে জড়ো করে যানবাহনে করে কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর সীমান্তের কাছাকাছি এনে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। তবে কুষ্টিয়ার ৪৭ বিজিবি’র দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের কোনো চেষ্টা সফল হতে দেয়নি সীমান্তরক্ষী বাহিনী। বর্তমানে ৪৭ বিজিবি’র আওতাধীন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের প্রায় ৪৬ কিলোমিটার এবং মেহেরপুরের গাংনী সীমান্তের ৩৬ কিলোমিটার এলাকায় বিজিবি সদস্যরা দিনরাত দায়িত্ব পালন করছেন। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন বিওপিতে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারাও বিজিবি’র সঙ্গে সমন্বয় করে নজরদারি ও টহল কার্যক্রমে সক্রিয় সহযোগিতা করছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ কামাল রনি গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, আমার দায়িত্বপূর্ণ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও মেহেরপুরের গাংনী সীমান্ত এলাকা দিয়ে একাধিকবার পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়েছে। আমরা কোনোভাবেই তা সমর্থন করিনি। সীমান্তে ২৪ ঘণ্টা টহল, মাইকিং ও সতর্কতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সম্ভাব্য পুশইন পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড়ের সদর উপজেলার বড়বাড়ি সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে পুশইন করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। শুক্রবার ভোরে উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ও সীমান্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তের মেইন পিলার ৭৫৮-এর ৫ নম্বর সাব-পিলার এলাকা দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার করে নারী ও পুরুষসহ মোট ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়। বিএসএফের ৯৩ ব্যাটালিয়নের টিয়াপাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা এ পুশইনের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তবে নীলফামারী ব্যাটালিয়ন ৫৬ বিজিবি’র বড়বাড়ি ক্যাম্পের টহলদল বাধা দিলে পুশইন হওয়া ব্যক্তিরা সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থান নেয়। পরে তারা ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ২০ গজের মধ্যে অবস্থান করতে দেখা যায়। এ ঘটনায় সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সমাধানের লক্ষ্যে বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত এলাকা দিয়ে নারী-পুরুষ এবং শিশুসহ ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএএফ)। বিজিবি’র তাৎক্ষণিক তৎপরতায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি তারা। বর্তমানে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। শুক্রবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। জানা যায়, হাঁপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে ৮৮ বিএসএফ পান্নাছাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১৭ জনকে নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত পথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা করে। সংবাদ পাওয়ার পর হাঁপানিয়া বিওপি’র টহলদল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উল্লেখিত ১৭ জনকে ভারতীয় শূন্য লাইনের অভ্যন্তরে অবস্থানরত অবস্থায় শনাক্ত করে। ১৭ জনের মধ্যে ৬ জন পুরুষ ৬ জন নারী এবং ৫ জন শিশু রয়েছে। বর্তমানে তারা শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিকালে নওগাঁ ব্যাটালিয়ন ১৬ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, সংবাদ পাওয়ার পরে ওই এলাকায় টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাউকে অনুপ্রবেশ করতে দেয়া হবে না। শূন্যরেখায় অবস্থানরত ১৭ জনকে ভারতে ফেরত নেয়ার জন্য বিএসএফকে বলা হয়েছে। তবে তারা তাদেরকে পুশইন করেনি এবং ফেরত নিতেও অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে ভারতীয় ভূখণ্ডে পাঠানোর (পুশ-ব্যাক) প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান নওগাঁ ব্যাটালিয়ান ১৬ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার আউলিয়ারহাট সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবি ও স্থানীয় জনতার বাধার মুখে ওই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। শুক্রবার সকালে তিস্তা ব্যাটালিয়নের অধীন ৬১ বিজিবি’র পঁয়ষট্টি বাড়ি বিওপি’র আওতাধীন ৮৪৬/১-এস ও ৮৪৬/২-এস সীমান্ত পিলারের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভারতের ৯৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের মহানদী ক্যাম্পের সদস্যরা ওই ১০ জনকে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি সদস্য ও স্থানীয় জনতা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের সীমান্তের জিরো লাইনে আটকে দেয়। পুশইন হওয়া ব্যক্তিরা হলেন, মোস্তফা বিশ্বাস (২৬), আজগার আলী (৫৪), মোর্শেদ (২০), রেহানা বিশ্বাস (২২), ফাতেমা বিবি (৩০), জাহেদা বেগম (৪০), অনুপা (২০), লিসা খাতুন (২৫), তাসলিমা (২৬) ও একটি শিশু। তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে। পঁয়ষট্টি বাড়ি বিওপি’র ক্যাম্প কমান্ডার নায়েব সুবেদার মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ঠেলে পাঠানো ২৮ জন সীমান্তের শূন্যরেখায় (নোম্যান্স ল্যান্ড) অবস্থান করছেন। বিএসএফ তাদের ফেরত নেয়নি। খোলা আকাশের নিচে বৃহস্পতিবার বিকালে ভারী বৃষ্টিতে তারা ভিজেছেন, এমনকি পর্যাপ্ত খাবারও পাচ্ছেন না। এরআগে, গত বুধবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে সীমান্তের ২০৩/৬-এর পিলারসংলগ্ন এলাকা দিয়ে ওই ২৮ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানো হয়। বিএসএফের ১২ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের ঠেলে পাঠান। ২৮ জনের মধ্যে ১২ পুরুষ, ১০ নারী ও ৬ শিশু রয়েছে। তবে বিজিবি’র প্রতিরোধের মুখে তারা বাংলাদেশে আসতে পারেননি। এরপর থেকেই তারা নোম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন।
বিজিবি ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই। ওই ২৮ জন সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন। বর্তমানে তারা সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে নোম্যান্স ল্যান্ডের ভারতীয় অংশের ৫০ গজ ভেতরে রয়েছেন। এর আগে গতকাল বিকালে বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই পতাকা বৈঠকে বিএসএফ ২৮ জনকে ঠেলে পাঠানোর কথা স্বীকার করে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করা হবে বলেও বিজিবিকে আশ্বস্ত করেন বিএসএফের কর্মকর্তারা। কিন্তু পরবর্তী সময় বিএসএফের পক্ষ থেকে বিজিবিকে আর কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ঘটনার পর গতকাল বিকালে বিজিবি’র রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কামাল হোসেন সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, পুশইন প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
