মায়ামির ব্রোঞ্জ ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ৬-৪ গোলের অবিশ্বাস্য জয়টি কাগজে-কলমে ইংল্যান্ডের জন্য এক ঐতিহাসিক প্রাপ্তি। ১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জেতার পর, গত ৬০ বছরের মধ্যে এটিই তাদের পুরুষ ফুটবল দলের সেরা বৈশ্বিক পারফরম্যান্স। তবে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর বৃটিশ মিডিয়া এবং ফুটবল মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে এক জটিল প্রশ্ন- তৃতীয় স্থান অর্জনকে কি সাফল্য হিসেবে দেখা হবে? নাকি এটি থ্রি লায়নদের জন্য আরেকটি হাতছাড়া হওয়া সুবর্ণ সুযোগ?
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধে চরম ভরাডুবি এবং দলের ভেতর কোচ থমাস টুখেলের রণকৌশল নিয়ে খেলোয়াড়দের অসন্তোষের যে খবর চাউর হয়েছে, তাতে এই ব্রোঞ্জ মেডেলের আনন্দ অনেকটাই ফিকে। একদিকে বিশ্বমঞ্চে দেশের বাইরে নিজেদের সেরা সাফল্য, অন্যদিকে ট্রফি না পাওয়ার আজন্ম আক্ষেপ। এই দুইয়ের দোলাচলে দাঁড়িয়ে এখন টুখেল আমলের মূল্যায়ন চলছে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে র্যাঙ্কিংয়ের চার নম্বরে থাকা ইংল্যান্ড টুর্নামেন্ট শেষ করেছে তিনে থেকে। পরিসংখ্যানের বিচারে এটি প্রমোশন হলেও, ফুটবল বিশ্লেষক ও সমর্থকদের বড় অংশ একে ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন। টুখেলকে মূলত নিয়োগই দেয়া হয় নকআউট পর্বের সেই চেনা বাধাগুলো টপকে ইংল্যান্ডকে ট্রফি জেতাতে। তবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে যখন আসল পরীক্ষা এলো, তখনই খেই হারালেন এই জার্মান ট্যাকটিশিয়ান। ১-০ তে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও অতি-রক্ষনাত্মক ও প্যাসিভ কৌশল বেছে নিয়ে টুখেল নিজেই দলের পতন ডেকে আনেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওয়েন রুনি থেকে শুরু করে গ্যারি লিনেকারের মতো সাবেক কিংবদন্তিরা এই ‘নেতিবাচক’ ফুটবলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ফলে এই বিশ্বকাপকে যখনই স্মরণ করা হবে, ট্রফির এত কাছে গিয়েও টুখেলের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ছিটকে যাওয়ার যন্ত্রণাই বেশি পোড়াবে সমর্থকদের।
সেমিফাইনালে বিদায়ের পর ইংল্যান্ড শিবিরের ভেতরের পরিবেশ ছিল পুরোপুরি বিধ্বস্ত। সহকারী ম্যানেজার অ্যান্থনি ব্যারি ফ্রান্স ম্যাচের হাফ-টাইমেই বিবিসিকে বলছিলেন, ‘ছেলেরা ভাঙা হৃদয় নিয়ে খেলছে। আমি মাঠে ১১ জন ভগ্নহৃদয়ের ফুটবলারকে দেখছি।’ তবে এই দুঃখের পেছনে কেবল ম্যাচ হারার বেদনাই ছিল না, ছিল কোচের ওপর চাপা ক্ষোভ। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ৩০ মিনিটে টুখেলের ডিফেন্সিভ ট্যাকটিক্স এবং খেলোয়াড় পরিবর্তনকে দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র ফুটবলার ভুল মনে করছেন। ফ্রান্স ম্যাচের আগে যখন মায়ামির গ্যালারিতে টুখেলের নাম ঘোষণা করা হয়, তখন দর্শকদের একাংশের দুয়ো ধ্বনি প্রমাণ করে সাধারণ সমর্থকরাও এই বিদায় সহজভাবে নেননি।
এই টুর্নামেন্টে হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিংহ্যাম নিজেদের বিশ্বমানের প্রমাণ দিয়ে দলকে টেনেছেন।
বেলিংহ্যাম ৭ গোল করে এক আসরে কোনো ইংলিশ খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েছেন। টটেনহ্যামের ফুল-ব্যাক ডিজেড স্পেন্সের লড়াকু পারফরম্যান্স কিংবা বুকায়ো সাকা ও অ্যান্থনি গর্ডনের অ্যাসিস্টের গ্রাফ ইংল্যান্ডের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। তবে প্রশ্ন হলো, টুখেল কি পারবেন ইউরোর আগে এই দলটিকে একটি নির্দিষ্ট এবং আগ্রাসী রূপ দিতে? ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে তিনি কিছুটা আক্রমণাত্মক স্বাধীনতা দেন এবং দল ছয় গোল করে জয় তুলে নেয়। তবে আসল চাপের ম্যাচে কেন এই রণকৌশল উধাও হয়ে যায়, সেই ধাঁধার সমাধান টুখেলকে দ্রুতই করতে হবে।
২০৩০ বিশ্বকাপ যখন গড়াবে, ততদিনে ইংল্যান্ডের ট্রফি খরা পার করবে দীর্ঘ ৬৪ বছর। ঘরের মাঠে ইউরো ২০২৮-এর ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন সত্যি করতে হলে টুখেলকে কেবল ব্রোঞ্জ মেডেলে সান্ত্বনা না খুঁজে ডিফেন্সের দুর্বলতা দূর করতে হবে। দলের তরুণ প্রতিভা, যেমন লিভারপুলের ১৭ বছর বয়সী রিও এনগুমো কিংবা আর্সেনালের ১৬ বছর বয়সী ম্যাক্স ডাউম্যানদের দ্রুত মূল দলে খাপ খাইয়ে নেয়ার পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
