বাটন এখন ইয়ামালের হাতে

বাটন এখন ইয়ামালের হাতে

ফন্ট সাইজ:

বাঁশি বাজার পর মাঠের দুই প্রান্তে তখন দুই ভিন্ন ছবি। এক প্রান্তে সতীর্থদের সঙ্গে নাচছেন, অপেক্ষা করছেন ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান ট্রফিটা হাতে তুলে নেয়ার। আর অন্য প্রান্তে চোখের জলে ভেঙে পড়া লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। হঠাৎই আবেগঘন দৃশ্য মিলে গেল একবিন্দুতে। নিজের উদ্‌যাপন থামিয়ে ছুটে গিয়ে ইয়ামাল জড়িয়ে ধরেন তার ছেলেবেলার নায়ককে। ৮০ হাজার ৬৬৩ জন দর্শকের সামনে আর বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি চোখের সামনে সেই আলিঙ্গনটা যেন শুধু দুই মানুষের সাক্ষাৎ ছিল না। ছিল দুই যুগের মধ্যে ব্যাটন হস্তান্তরের এক নীরব মুহূর্ত।

ফাইনালের আগে থেকেই গোটা বিশ্ব মেতেছিল এক আলোচনায়। ১৯ বছরের ইয়ামাল বনাম ৩৯ বছরের মেসি। তরুণ বনাম প্রবীণ, ভবিষ্যৎ বনাম অতীত। ভবিষ্যতের ব্যালন ডি’অর বনাম ইতিহাসের সর্বকালের সেরা। এই তুলনাটা অস্বাভাবিক ছিল না মোটেও। বার্সেলোনার ডান প্রান্তের নিয়ন্ত্রণ এখন ইয়ামালের হাতে। গায়ে জড়িয়ে আছে মেসির সেই কিংবদন্তি ১০ নম্বর জার্সি। বাঁ পায়ের জাদুকরী ড্রিবলিং দিয়ে বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডারদেরও বোকা বানানোর সামর্থ্য রাখেন তিনি। তা সে একক নৈপুণ্যে গোল হোক বা ট্রিভেলা কিকে অ্যাসিস্ট। ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ডেভিড বেকহাম একবার বলেছিলেন, ‘আমার মতে মেসির সঙ্গে কারও তুলনা করা যায় না, তবে আমি যা দেখেছি তার মধ্যে ইয়ামালই সবচেয়ে কাছাকাছি।’

২০০৭ সালে ছোট্ট ইয়ামালকে কোলে নিয়ে মেসির সেই ভাইরাল ছবিটার কথা মনে করলে বোঝা যায়, এই ফাইনালের মঞ্চটা যেন আগে থেকেই লেখা ছিল নিয়তির খাতায়। স্কোরশিটে হয়তো ইয়ামালের নাম নেই, কিন্তু মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তার ১২০ মিনিটের পারফরম্যান্স বলে দেয় অনেক কিছু। পুরো নির্ধারিত সময় জুড়ে প্রায় একাই স্পেনের আক্রমণের বিপদ তৈরি করে গেছেন তিনি। ডান প্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে ছুটে গিয়ে প্রতিপক্ষ রক্ষণকে বারবার টেনে এনেছেন নিজের দিকে। যতবারই বল পেয়েছেন, মনে হয়েছে একটা মসৃণ মুভেই আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের পরীক্ষা নিতে চলেছেন তিনি। নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর বিরুদ্ধে বারবার দ্বৈরথে নিজের দুর্দান্ত ড্রিবলিং সামর্থ্যের প্রদর্শনী দেখিয়েছেন। এটাই ছিল ইয়ামালের এবারের বিশ্বকাপের সারসংক্ষেপ। গোলের খাতায় নাম না উঠলেও প্রতিটি মুহূর্তে নিজের প্রতিভা আর তীব্রতার প্রমাণ রেখে গেছেন তিনি। ২০২৪ ইউরোর সেই অবিশ্বাস্য মৌসুমের মতো একের পর এক রেকর্ড না ভাঙলেও, উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপে তার অবদান স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ে কোনো অংশে কম নয়। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের চঞ্চলতাকে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত মানসিকতার সঙ্গে মিলিয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলে নিখুঁতভাবে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। স্প্যানিশ কোচ, যার জীবনবৃত্তান্তে এখন যুক্ত হলো বিশ্বকাপও। কখনো ইয়মালের প্রতিভাকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করেননি। মাঠে আর মাঠের বাইরে তাকে নিজের মতো খেলার স্বাধীনতা দিলে তা শিরোপায় রূপ নেবে- এই বিশ্বাস ছিল ফুয়েন্তের। আর সেই বিশ্বাসই সত্যি হলো।

স্পেন যখন শিরোপা উদ্‌যাপনে মত্ত, মেসির মনে নিশ্চয়ই ভেসে উঠেছিল গত ২১ বছরে আর্জেন্টিনার হয়ে বারবার রানার্সআপ হওয়ার তিক্ত স্মৃতিগুলো। ২০০৭ কোপা আমেরিকা, ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ কোপা আমেরিকা আর ২০১৬ কোপা আমেরিকা সেন্তেনারিও। প্রতিটিতেই রানার্সআপ হয়ে থামতে হয়েছিল তাকে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে প্রথম বড় শিরোপা জিততে জিততে মেসির বয়স হয়ে গিয়েছিল ৩৪ বছর। এই পথটা এতটাই যন্ত্রণাদায়ক আর হতাশাজনক ছিল যে, আট বারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা ২০১৬ সালের জুনে জাতীয় দল থেকে অবসরই নিয়ে নিয়েছিলেন। যদিও দ্রুতই সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তিনি। তবু শিরোপার দেখা মিলছিল না যতদিন না লিওনেল স্কালোনি দায়িত্ব নেন। এরপরের ছয় বছরে দু’টি কোপা আমেরিকা আর ২০২২ বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনাকে এক ঐক্যবদ্ধ দলে রূপান্তরিত করেন স্কালোনি। বিশ্বকাপের আগে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি চাই মেসি খেলা চালিয়ে যাক, কারণ তাকে মাঠে না দেখাটা কষ্টদায়ক, যেমনটা হয়েছিল দিয়াগো ম্যারাডোনার বেলায়। এই খেলোয়াড়রা ফুটবলের ইতিহাসে ছাপ রেখে গেছেন। তাকে আর খেলতে না দেখার ভাবনাটাই মনে শান্তি দেয় না।’ কিন্তু ফাইনালে সেই স্বপ্নের সমাপ্তি লেখা হলো ভিন্নভাবে। টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি অধরাই থেকে গেল স্কালোনির।

যেদিন ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার দাবিটা আরও পোক্ত করার সুযোগ ছিল, সেদিন মেসি রইলেন প্রায় নীরব এক দর্শক হয়েই। ১২০ মিনিটের খেলায় একটিও সুযোগ তৈরি করতে পারেননি তিনি। নিয়েছিলেন মাত্র একটি শট, যা প্রতিহত হয়ে যায় রক্ষণেই। সান্ত্বনা হিসেবে সিলভার বল আর সিলভার বুট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়বেন মেসি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা যা এনে দিতে পারতো, তার ধারেকাছেও নেই এই পুরস্কারগুলো। অবশ্য আর্জেন্টিনার হারের দায় শুধু মেসির কাঁধেই বর্তায় না। নির্ধারিত সময়ের শেষভাগে এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড আর সুযোগ তৈরিতে ব্যর্থতাই মূলত ডুবিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। ইতিহাসের বইয়ে লেখা থাকবে, ইয়ামাল আর তার সতীর্থরা মেসিকে বিশ্বমঞ্চ থেকে বীরোচিত বিদায় নিতে দেননি। লেখা থাকবে, সর্বকালের এক মহানায়ক হেরে গেছেন এমন এক নতুন প্রতিভার কাছে। যার নিয়তিই যেন লেখা আছে ক্লাব আর জাতীয় দল- দুই পর্যায়েই মেসির নামের ওপরে, হয়তো তারও ওপরে নিজের নাম খোদাই করার। এক অর্থে, এই পুরো বিশ্বকাপটাই যেন হয়ে দাঁড়ালো নতুন প্রজন্মের তারকাদের হাতে মেসির উত্তরাধিকার তুলে দেয়ার এক মঞ্চ। ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে ছিনিয়ে নিয়েছেন গোল্ডেন বুট আর বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড। আর এখন বিশ্বকাপ শিরোপাটাও ছিনিয়ে নিলেন ইয়ামাল। মেসির উত্তরাধিকার নিঃসন্দেহে থেকে যাবে চিরকাল, তবে ফুটবল বিশ্বের এখন হয়তো সময় হয়ে গেছে এই কিংবদন্তিকে নিয়ে অতীতকালেই কথা বলার। বিশেষত যখন প্রসঙ্গ আসে বিশ্বমঞ্চের। আর ইয়ামাল? তার যাত্রা তো সবে শুরু হলো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন