বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের ঘরই বাবা-মায়ের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। যে মা-বাবা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেন, বার্ধক্যে তাদের প্রত্যাশা থাকে সামান্য যত্ন, সম্মান ও ভরণপোষণ। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দেশে ক্রমেই বাড়ছে অবহেলিত, নির্যাতিত ও পরিত্যক্ত প্রবীণের সংখ্যা। সন্তানদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে অনেক মা-বাবা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ তাদের সুরক্ষায় থাকা পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর কার্যকারিতা নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন। মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে একটি বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পর তার সন্তানদের অবহেলার বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। নূরজাহান বেগম নামের এই নারীর এক ছেলে যুগ্ম সচিব, এক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক ও এক ছেলে কানাডা প্রবাসী।
আইন অনুযায়ী সন্তানদের জন্য ভরণপোষণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হলেও শাস্তির বিধান সীমিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। অর্থদণ্ড অনাদায়ী হলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সরাসরি কারাদণ্ডের সুযোগ না থাকায় আইনটি যথেষ্ট ভীতির সঞ্চার করতে পারছে না বলে মনে করছেন আইনজীবী, সমাজবিজ্ঞানী ও প্রবীণ অধিকারকর্মীরা। শুধু তাই নয়, আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত কোনো অভিযোগ আমলে নিতে পারে না। ফলে শয্যাশায়ী, অসুস্থ, স্মৃতিভ্রম, প্রতিবন্ধী কিংবা মানসিকভাবে দুর্বল প্রবীণদের অনেকেই আইনি সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
রাজধানীর মিরপুরে বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা ও ভরণপোষণ না দেয়ার অভিযোগে এক সরকারি কর্মকর্তাকে ঘিরে আলোচনার মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর সীমাবদ্ধতা। আইন বিশেষজ্ঞ, প্রবীণ অধিকারকর্মী এবং প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান আইন বাস্তবতার তুলনায় দুর্বল। বিশেষ করে অসহায় ও অতি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পক্ষে আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধ। এ কারণে আইনটি সংশোধনের দাবি জোরালো হচ্ছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে এই শাস্তি অপর্যাপ্ত। ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক বাস্তবতা আর ২০২৬ সালের বাস্তবতা এক নয়। দ্রব্যমূল্য, চিকিৎসা ব্যয় এবং প্রবীণদের জীবনযাত্রার খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে আইনটির শাস্তির বিধান পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ আইন সমিতির দপ্তর সম্পাদক বেল্লাল হোসাইন (মুন্সি বেল্লাল) মানবজমিনকে বলেন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি দ্রুত সংশোধন প্রয়োজন। এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ১ লাখ টাকা। পিতা-মাতা ছাড়া অন্য কেউ মামলাও করতে পারে না। তিনি বলেন, আইনটি সংশোধন করে নিকট আত্মীয়স্বজন, সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ নির্দিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের অভিযোগ দায়েরের ক্ষমতা দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অর্থদণ্ডের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সরাসরি কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
এদিকে সরকারি চাকরিজীবী সন্তানদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান প্রশাসনিক বিধানের আওতায় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠেছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণের দায়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
আইনেরও প্রয়োগ নেই: ২০১৩ সালে ব্যাপক আলোচনার মধ্যদিয়ে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন প্রণয়ন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সন্তানদের মাধ্যমে প্রবীণ মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তান তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য। পিতা বা মাতা আলাদাভাবে বসবাস করলেও তাদের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহনের দায়িত্ব সন্তানের ওপর বর্তাবে। কিন্তু বাস্তবে বহু প্রবীণ অভিযোগ করেন, সন্তানদের আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা দায়িত্ব পালন করেন না। প্রবীণদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের তথ্যমতে, বর্তমানে শহরাঞ্চলে একাকী বসবাসকারী প্রবীণের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা বিদেশে বা অন্য শহরে থাকলেও বাবা-মায়ের খোঁজখবর রাখেন না। আবার একই শহরে থেকেও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আইনের সীমাবদ্ধতা: আইনের সবচেয়ে আলোচিত সীমাবদ্ধতা ৭ (২) ধারায়। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো আদালত এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত আমল গ্রহণ করিবে না। ফলে কোনো প্রতিবেশী, আত্মীয়, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবা কর্মকর্তা কিংবা মানবাধিকার সংগঠন চাইলেও মামলা করতে পারে না। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন ৮০ বা ৯০ বছর বয়সী অসুস্থ ব্যক্তি যদি সন্তানদের অবহেলার শিকার হন, তাহলে তার পক্ষে থানায় যাওয়া, আইনজীবী নিয়োগ করা কিংবা আদালতে অভিযোগ দায়ের করা- অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। ফলে আইন থাকার পরও অসংখ্য ঘটনা আইনের আওতায় আসে না।
সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার বলেন, দীর্ঘদিন ভরণপোষণ না দেয়া, চিকিৎসা ব্যয় বহন না করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে বাবা-মা’কে পরিত্যাগ করার মতো ঘটনায় কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধিকেও এ ক্ষমতা দেয়া হলে আইনের বাস্তব প্রয়োগ বাড়বে।
প্রবীণ অধিকার কর্মীদের মতে, শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না। প্রবীণদের জন্য জরুরি হেল্পলাইন, আইনি সহায়তা সেল, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তারা বলছেন, উন্নত বিশ্বের বহু দেশে প্রবীণ নির্যাতনকে আলাদা অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেও সেই ধরনের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
