জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের (২০২৬-২০২৭) সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বাংলাদেশ ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করে। এর মাধ্যমে প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশ আবারও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত হলো। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই নির্বাচন ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী অনুমোদন; বরং এটি ছিল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার প্রতি বিশ্বাসের প্রতিফলন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর শ্রীলংকা (১৯৭৬-৭৭) এবং মালদ্বীপ (২০২১-২০২২) ছাড়া দক্ষিণ এশিয়া থেকে আর কোনো দেশ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়নি, যেখানে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত দুইবার এই বিশ্বসভার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
তবে এই সাফল্যের তাৎপর্য বোঝার ক্ষেত্রে বাস্তবতাও মাথায় রাখা জরুরি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না, জাতিসংঘের সংস্থাগুলো পরিচালনা করেন না, নিরাপত্তা পরিষদের মতো বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না, কিংবা উন্নয়ন তহবিল বণ্টনের ক্ষমতাও তাঁর নেই। অর্থাৎ এই পদ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে সরাসরি পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেয় না। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব কেবল আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; অনেক সময় আলোচনার দিক নির্ধারণ, বিষয়গুলোকে বৈশ্বিক অগ্রাধিকারে পরিণত করা, কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনই বড় ভূমিকা পালন করে। ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের গুরুত্ব মূলত এখানেই।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এজেন্ডা নির্ধারণ ও ঐকমত্য গঠনের ক্ষমতা। তিনি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন, বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করেন এবং ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি করেন। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন না, কিন্তু কোন বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাবে এবং কোন বিষয়গুলো বৈশ্বিক মনোযোগে থাকবে, সে ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য এই সুযোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ মূলত উন্নয়নশীল দেশ, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র, স্বল্পোন্নত দেশ এবং শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণকারী দেশগুলোর পক্ষে কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ বাংলাদেশের জন্য এক নতুন অবস্থান তৈরি করেছে—যেখানে দেশটি কেবল নিজের স্বার্থের পক্ষে কথা বলবে না, বরং বৈশ্বিক আলোচনার সঞ্চালক ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও ভূমিকা রাখবে। এই অবস্থান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও কূটনৈতিক প্রভাবকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
ড. খলিলুর রহমানের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবাধিকার, উদীয়মান প্রযুক্তির সুশাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কার। এগুলো শুধু বৈশ্বিক বিষয় নয়; বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বর্তমানে অনেক উন্নয়নশীল দেশ উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। বাংলাদেশও এই চ্যালেঞ্জগুলোর বাইরে নয়। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. রহমান উন্নয়ন অর্থায়ন, ঋণ স্থিতিশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তা, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মতো বিষয়গুলোকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় অগ্রাধিকার দিতে পারেন। তিনি কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না, কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের দাবিগুলোকে দৃশ্যমান রাখতে পারবেন।
জলবায়ু কূটনীতির ক্ষেত্রে এই পদ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশ বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তঃসরকারি জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (আইপিসিসি) বহুবার বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ড. রহমানের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন তহবিল, ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের দাবিগুলো কী আরও জোরালোভাবে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করবে।
রোহিঙ্গা সংকটও এমন একটি বিষয় যেখানে ড. রহমানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য পরোক্ষভাবে সহায়ক হতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১১ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক মনোযোগ এবং মানবিক সহায়তা উভয়ই কমে এসেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের সাবেক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে ড. রহমান বিষয়টি গভীরভাবে বোঝেন। যদিও তাকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, তবুও শরণার্থী সুরক্ষা, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং মানবিক সহায়তার মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জকে দৃশ্যমান রাখতে সহায়তা করতে পারেন।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য ও পুলিশ প্রেরণকারী শীর্ষ দেশগুলোর একটি। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শান্তিরক্ষা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিরোধমূলক কূটনীতি নিয়ে ড. রহমানের জোরালো অবস্থান বাংলাদেশের এই অবদানকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও দৃশ্যমান করতে পারে এবং শান্তিরক্ষা সংস্কার সংক্রান্ত আলোচনায় বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।
উদীয়মান প্রযুক্তি, বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল বৈষম্য, তথ্য সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত নৈতিকতা আগামী দশকের বৈশ্বিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। ঐতিহাসিকভাবে এসব বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা সীমিত ছিল। ড. রহমান যদি এআই ও ডিজিটাল সুশাসনকে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল বিশ্বের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
এছাড়া এই পদ বাংলাদেশের কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেরও বিরল সুযোগ এনে দেবে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলের রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই সম্পর্কগুলো ভবিষ্যতে যে কোনো আন্তর্জাতিক পদের নির্বাচনে সমর্থন অর্জন, জোট গঠন, উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কূটনৈতিক সহায়তা পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে, এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও সফট পাওয়ার বৃদ্ধিতে নিহিত। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ৯৯টি রাষ্ট্রের সমর্থন প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ বাংলাদেশকে গঠনমূলক, দায়িত্বশীল এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। এই মর্যাদা ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ফোরামে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দিতে পারে।
ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে নয় যে এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরাসরি পরিচালনার ক্ষমতা দিচ্ছে। বরং এর গুরুত্ব নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে তার পরোক্ষ প্রভাব, কূটনৈতিক মর্যাদা, আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং এজেন্ডা নির্ধারণের সুযোগের মধ্যে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে শক্তিশালী করতে পারে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে জলবায়ু ন্যায়বিচার, রোহিঙ্গা সংকট, টেকসই উন্নয়ন, শান্তিরক্ষা এবং প্রযুক্তি সুশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও জোরালো ভাবে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে এই এক বছরের মেয়াদ বাংলাদেশের জন্য এমন এক কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে, যার সুফল বহু বছর ধরে অনুভূত হবে।
চার দশক আগে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী যেমন জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আলোচনার মঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন, তেমনি আজ ড. খলিলুর রহমানের সামনে সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশকে একটি দায়িত্বশীল, সেতুবন্ধনকারী এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার। এই পদ হয়তো সরাসরি ক্ষমতা দেয় না, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় আলোচনার গতিপথ নির্ধারণ করার ক্ষমতাই সবচেয়ে মূল্যবান শক্তি হয়ে ওঠে।

Mohammad Harun Rashid
৫৪ মিনিট আগেঅসাধারণ বিশ্লেষণ। এই বিজয় নিশ্চিত ভাবেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি গতি পাবে এবং বিশ্ব ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় হবে।