মৃত্যু নয়, বিবেককে কাঁদায় নূরজাহান বেগমের অপেক্ষা

মৃত্যু নয়, বিবেককে কাঁদায় নূরজাহান বেগমের অপেক্ষা

ফন্ট সাইজ:

মৃত্যু নয়, বিবেককে কাঁদায় নূরজাহান বেগমের অপেক্ষা! মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি কয়েকদিন ধরেই দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। সাত দিন আগে মারা যাওয়া ওই বৃদ্ধার মরদেহ পড়ে ছিল ঘরের ভেতর। চারপাশে আবর্জনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিঃসঙ্গতার নির্মম চিহ্ন। পুলিশ দরজা ভেঙে ঢুকে তার মরদেহ উদ্ধার করেছে। এরপর শুরু হয়েছে সামাজিক বিচার, নৈতিক ক্ষোভ, দোষারোপ আর প্রশ্নের ঝড়।

কারও চোখে এটি কিছু ‘অকৃতজ্ঞ সন্তানের’ গল্প। কারও কাছে এটি পারিবারিক অবহেলার চরম উদাহরণ। আবার কেউ কেউ এটিকে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি সম্ভবত মৃত্যু নয়। মৃত্যু একদিন সবারই আসে। হৃদয় ভেঙে দেয় যে বিষয়টি, তা হলো মৃত্যুর আগে একজন মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা।

একজন মা তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কীভাবে কাটিয়েছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর আমরা হয়তো কখনো পুরোপুরি জানতে পারব না। কিন্তু অনুমান করতে পারি। হয়তো প্রতিদিন সকালে ঘুম ভেঙে তিনি কারও ফোনের অপেক্ষা করেছেন। হয়তো বিকেলে দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। হয়তো রাতে শুয়ে ভেবেছেন, আজ কেউ খোঁজ নিল না, কাল হয়তো নেবে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদা কমে যায়। বড় বাড়ি, বড় পদ, বড় সম্পদ, এসবের আকর্ষণ হারিয়ে যায়। তখন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় সঙ্গ, যত্ন এবং অনুভব করা যে তিনি এখনও কারও কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক সমাজে এই অনুভূতিটিই সবচেয়ে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রযুক্তি মানুষকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সংযুক্ত করেছে, কিন্তু একই পরিবারের মানুষদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েছে। সন্তানরা কর্মজীবনে ব্যস্ত, নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, জীবনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। বৃদ্ধ বাবা-মা ধীরে ধীরে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকার নিচের দিকে নেমে যান।

এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এটি বিশ্বব্যাপী এক বাস্তবতা। কয়েক বছর আগে এক বিদেশি বলেছিলেন, অবসরের সময় তার অন্তত এক মিলিয়ন ডলার সঞ্চয় থাকা দরকার। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, “আমি চাই না জীবনের শেষ সময়ে কারও ওপর বোঝা হতে। আমি এমন জায়গায় থাকতে চাই, যেখানে আমার যত্ন নেওয়ার জন্য পেশাদার মানুষ থাকবে।” কথাটা শুনে তখন বিস্মিত হয়েছিলাম। আমাদের সমাজে তো ধারণা, বার্ধক্যে সন্তানই হবে শেষ আশ্রয়। কিন্তু বাস্তবতা ক্রমশ বদলাচ্ছে।

আজ প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনও সেই পুরোনো সামাজিক ধারণার ভেতরে আটকে আছি, অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ বদলে গেছে?

বাংলাদেশে একজন বাবা-মা সন্তানের জন্য নিজের সবকিছু উজাড় করে দেন। নিজের চিকিৎসা, নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের নিরাপত্তা, সবকিছুর আগে সন্তানের পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে, বাড়ি, প্রতিষ্ঠা। সন্তান মানুষ করাকেই জীবনের একমাত্র বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন অনেকে।

কিন্তু এই মডেল কি আজও টেকসই?

সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব অবশ্যই আছে। নৈতিক, ধর্মীয় এবং মানবিক—সব দিক থেকেই আছে। কিন্তু শুধু সন্তানের ওপর নির্ভরশীল একটি বার্ধক্য-ব্যবস্থা কি যথেষ্ট?
নূরজাহান বেগমের ঘটনা আমাদের সামনে সেই প্রশ্নটিই নতুন করে তুলে ধরেছে।
আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে এখনও “বৃদ্ধাশ্রম” শব্দটি প্রায় অপমানের প্রতিশব্দ। কেউ বৃদ্ধাশ্রমে থাকলে ধরে নেওয়া হয়, তাকে পরিবার পরিত্যাগ করেছে। যেন এটি ভালোবাসাহীনতার একটি সরকারি সনদ।

কিন্তু বাস্তবতা কি এত সরল? অনেক উন্নত দেশে আধুনিক সিনিয়র লিভিং কমিউনিটি, অ্যাসিস্টেড লিভিং সেন্টার কিংবা কেয়ার হোম রয়েছে। সেখানে মানুষকে শুধু বাঁচিয়ে রাখা হয় না; তাকে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের সুযোগ দেওয়া হয়।

২৪ ঘণ্টার চিকিৎসা সুবিধা, প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপত্তা, সামাজিক মেলামেশা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ব্যায়াম, বই পড়া, আড্ডা—সবকিছুর ব্যবস্থা থাকে। একজন প্রবীণ মানুষ সেখানে নিজেকে পরিত্যক্ত নয়, বরং সুরক্ষিত মনে করেন।

আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে আবেগ আছে, কিন্তু বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেই।
আমরা এখনও মনে করি, বার্ধক্য পুরোপুরি পারিবারিক বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই। সমাজের কোনো দায় নেই। নাগরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো কর্তব্য নেই। এটি একটি বিপজ্জনক ধারণা।
শিশুর জন্য যেমন স্কুল দরকার, রোগীর জন্য যেমন হাসপাতাল দরকার, তেমনি প্রবীণ মানুষের জন্যও একটি সুসংগঠিত যত্নব্যবস্থা প্রয়োজন। এটি বিলাসিতা নয়, একটি মৌলিক মানবিক প্রয়োজন।
আজ বাংলাদেশ দ্রুত বার্ধক্যমুখী সমাজে পরিণত হচ্ছে। গড় আয়ু বেড়েছে। চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। ফলে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি প্রবীণ-সেবা অবকাঠামো। না আছে পর্যাপ্ত জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা, না আছে বিস্তৃত হোম-কেয়ার নেটওয়ার্ক, না আছে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী বৃদ্ধ নিবাসের ব্যবস্থা।

ফলে অসংখ্য প্রবীণ মানুষ এক ধরনের অদৃশ্য সংকটে বাস করছেন। তারা হয়তো অনাহারে নেই, কিন্তু নিঃসঙ্গ। তারা হয়তো মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন, কিন্তু পাননি সঙ্গ। হয়তো তাদের সন্তানরা অর্থ পাঠান, কিন্তু সময় দেন না।

মানুষ শুধু খাবার আর ওষুধে বাঁচে না। মানুষ বাঁচে সম্পর্কের উষ্ণতায়, কথোপকথনে, স্পর্শে, খোঁজখবর নেওয়ার অনুভূতিতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন নূরজাহান বেগমের সন্তানদের নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। কেউ তাদের চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান টেনে এনে প্রশ্ন তুলছেন—এত শিক্ষিত হয়েও কীভাবে তারা এমন করলেন?

কিন্তু শুধু ব্যক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালে সমস্যার গভীরতা ধরা পড়বে না।
কারণ এই ঘটনা একজন নূরজাহান বেগমের নয়। আমাদের আশপাশে হয়তো আরও অনেক প্রবীণ মানুষ আছেন, যারা প্রতিদিন নিঃসঙ্গতার সঙ্গে লড়াই করছেন। পার্থক্য শুধু, তাদের গল্প সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়নি।

এই মৃত্যু আমাদের একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে, উচ্চশিক্ষা, অর্থনৈতিক সাফল্য কিংবা সামাজিক মর্যাদা সবসময় মানবিকতার নিশ্চয়তা দেয় না। একই সঙ্গে এটাও মনে করিয়ে দিয়েছে, শুধু পারিবারিক মূল্যবোধের গল্প বলে আমরা বার্ধক্যের সংকট সমাধান করতে পারব না।
প্রয়োজন একটি নতুন সামাজিক চুক্তি। যেখানে পরিবার থাকবে, সন্তানের দায়িত্ব থাকবে, ভালোবাসা থাকবে। কিন্তু তার পাশাপাশি থাকবে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট নীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, মানসম্মত প্রবীণ-সেবা কেন্দ্র, হোম-কেয়ার ব্যবস্থা এবং মর্যাদাপূর্ণ বৃদ্ধ নিবাস।

বার্ধক্য কোনো অপরাধ নয়। নির্ভরতা কোনো লজ্জা নয়। লজ্জা হলো এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ সারাজীবন পরিবার ও সন্তানের জন্য নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন।

নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর বিচার আদালত করবে, তদন্ত কমিটি করবে, আইন তার নিজস্ব পথে চলবে। কিন্তু সমাজ হিসেবে আমাদেরও আত্মসমালোচনা করা দরকার।

কারণ একটি মরদেহ সাত দিন পরে উদ্ধার হওয়া শুধু একজন বৃদ্ধার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সামাজিক সম্পর্কের ভাঙন, আমাদের নীতিগত শূন্যতা এবং আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি।
নূরজাহান বেগম আর ফিরবেন না। কিন্তু তার নিঃসঙ্গ মৃত্যুর গল্প আমাদের সামনে একটি জরুরি প্রশ্ন রেখে গেছে—আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে বার্ধক্য মানে অপেক্ষা, অবহেলা ও একাকীত্ব?

নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে একজন মানুষ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মর্যাদা, নিরাপত্তা, সঙ্গ এবং যত্ন নিয়ে বাঁচতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের সভ্যতার প্রকৃত মান।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন