চকবাজারে ১০০ আইটেমের বাহারি ইফতার

চকবাজারে ১০০ আইটেমের বাহারি ইফতার

ফন্ট সাইজ:

রমজান এলেই হরেক রকমের ঐতিহ্যবাহী ইফতারের মেলা বসে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে। প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো বাজার। বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে আসেন চকের ইফতারের স্বাদ নিতে। বৃহস্পতিবার রমজানের প্রথম দিনেই জমে উঠেছে এই বাজার। বাহারি রকম আর স্বাদের ইফতারের পসরা নিয়ে বসেন সেখানকার বিক্রেতারা। আর সেসব পসরা ঘিরেই ভিড় জমান হাজারো ক্রেতা আর রোজাদাররা।

গতকাল বিকালে সরজমিন চকবাজারের এই ইফতারির বাজার ঘুরে দেখা যায়, আসরের আগ থেকেই বিক্রেতারা তাদের বাহারি ইফতারির পসরা সাজাতে শুরু করেন। কেউ কাবাবের শিকে মাংস গেঁথে আগুনে দিচ্ছেন, কেউ বড় ট্রেতে সাজাচ্ছিলেন সোনালি জিলাপি, আবার কেউ কাঁচের জারে ঢালছেন কাশ্মীরি ও ইরানি শরবত। দুপুরের দিকে কেউ ভাঁজছিলেন পিয়াজু, কেউবা আবার সাজাচ্ছিলেন বেগুনি, আলুর চপ কিংবা ডিম চপ। বড় হাঁড়িতে হালিম নাড়ছেন কর্মচারীরা, তার পাশেই আবার ধনিয়া। ছিল পুদিনা, লেবু, শসা, কাঁচা মরিচের পসরা। দোকান বড় হোক কিংবা ছোট, ছোলা বুট আর মুড়ির উপস্থিতি ছিল সর্বজনীন। দূর-দূরান্ত থেকে এসে ভিড় করছিলেন হাজারো ক্রেতা। ইফতারির ঠিক আধ-ঘণ্টা আগে যেন পা ফেলার জো ছিল না ইফতারির বাজারে। শেষ সময়ে ইফতারির দোকানগুলোর সামনে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়ে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল না। ইফতারের পনেরো মিনিট পূর্বে কমে যায় ক্রেতাদের সংখ্যা। তখন বেশির ভাগ ক্রেতাই চলে যান নিজ নিজ গন্তব্যে ইফতার করার উদ্দেশ্যে।

চকবাজারের ইফতারের মেন্যুতে রয়েছে- আস্ত মুরগির কাবাব, মোরগ মুসাল্লম, বিফ টিকা, মুরগির চপ, বটি-কাবাব, টিকা-কাবাব, কোফ্‌তা, চিকেন কাঠি, শামি-কাবাব, শিকের ভারী কাবাব, সুতি-কাবাব, কোয়েল পাখির রোস্ট, কবুতরের রোস্ট, জিলাপি, শাহি জিলাপি, নিমকপারা, হালুয়া, হালিম, দইবড়া, লাবাং, কাশ্মীরি শরবত, ইরানি শরবতসহ প্রায় ১০০ ধরনের খাবার। তাছাড়া, ইফতারির এই বাজারের সবচেয়ে জনপ্রিয় আইটেম ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। বিক্রেতারা বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়, ধনী-গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়- এই পুরাণ শ্লোক বলে বলে আকর্ষণ করেন ক্রেতাদের।

রুবেল নামের এক বিক্রেতা মানবজমিনকে বলেন, গরুর কবাব বিক্রি করি ১০০০ টাকায়, খাসিরটা ৪০০ টাকা। তিনি বলেন, আমার বয়স ৩৮। আমার বাবা এই ব্যবসায় করেছে, আমার দাদা করেছে, এখন আমি করছি। এখন আমার ছেলেমেয়েরা করে কি না জানি না। ইফতারের বিশ মিনিট আগে রবিউল নামের আরেক বিক্রেতা বলেন, আমার পণ্য ইনশাআল্লাহ প্রায় শেষ পর্যায়ে। যেটুকু আছে ওইটুকুও ইনশাআল্লাহ শেষ হয়ে যাবে। যা রয়ে যাবে তা যারা ফেরি করে বিক্রি করে ওদের কাছে আমরা বিক্রি করে দেই। মোহাম্মদ জুয়েল নামের এক বিক্রেতা বলেন, বড় বাপের পোলা ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। বড় বাপের পোলা ১২টা আইটেম ১২টা মশলা মিক্স। চকবাজার ইফতারি বাজার বড় বাপের পোলা নামের উপরেই ইফতারি বাজার। এ ছাড়া মুরগি আছে ৩৫০ টাকা। খাসির লেগরোস্ট আছে ৮০০ টাকা পিস। কোয়েল পাখি আছে ৮০ টাকা পিস। দুধমান পরোটা আছে ৬০ টাকা পিস।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বড় বাপের পোলায় খায় কেজি ৮০০ টাকা, সুতিকাবাব ১,০০০ টাকা, খাসির কাবাব ১,২০০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। সুতি কাবাব বা সুতলি কাবাব চকবাজারে উৎপন্ন বিখ্যাত একটি কাবাব। এই কাবাব প্রস্তুত করা হয় গরুর মাংস বা খাসির মাংসের কিমা এবং বিভিন্ন রকমের মসলা থেকে। ইফতারির বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ কাবাব। বাজারে ক্রেতাদের আকর্ষণের ছিল- টানা পরোটা বা তন্দুর পরোটা। এই টানা পরোটার ভেতরে গরু বা মুরগির মাংসের পুর দিয়ে তৈরি হয় কিমা পরোটা। চকবাজারের ইফতারি বাজারে এলে কিমা পরোটার স্বাদ নেয়ার জন্য ভিড় করেন অসংখ্য ক্রেতা।

বাজারে শিক কাবাব ১২০-১৫০ টাকা, কাঠি কাবাব ৮০-১০০ টাকা, কবুতর ১৫০ টাকা, কোয়েল ৮০ টাকা, আস্ত মুরগি ২৫০-৩৫০ টাকা, খাসির লেগরোস্ট ১,০০০ টাকা, ঝাল পরোটা ৬০ টাকা। হালিম পরিমাণভেদে ১৫০-৬০০ টাকা, ডিমচপ ২০ টাকা। আলুচপ, পিয়াজু, বেগুনি, সিঙ্গারা ও সমুচা ৫১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাহি জিলাপি ও রসমালাইদই কেজি ৩৫০ টাকা, দুধসর ৪৫০ টাকা, ঘিয়ে ভাজা জিলাপি ৩০০ টাকা, জাফরান শরবত লিটারপ্রতি ৩০০ টাকা। তাছাড়া দইবড়া ৩০টা পিস, হালুয়া পরিমাণভেদে ৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে বাজারে।

ঢাকার মগবাজার থেকে ইফতার কিনতে আসা মো. শফিউদ্দিন বলেন, পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে আজ ইফতার করবো। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ইফতার কিনতে এসেছি। খাসি ও মুরগির রান, বড় বাপের পোলায় খায় কিনলাম। পিয়াজু, ছোলা-বুট বাসায় ব্যবস্থা হচ্ছে। মো. আবির আহমেদ নামে এক ক্রেতা বলেন, ছোট-বড় সব বয়সী রোজাদারের বড় বাপের পোলায় খায় প্রিয় খাবার। এখানে রীতিমতো কাড়াকাড়ি অবস্থা। রোজা শুরুর প্রথমদিক হওয়ায় ভিড় বেশি। কয়েকদিন পরে কমে যাবে হয়তো। পুরান ঢাকার বাসিন্দা রহমত মিয়াজী বলেন, রমজান এলে চকবাজারে না এলে যেন ইফতারই পূর্ণ হয় না। পরিবারের আবদারে এবারো এসেছি। তবে গত কয়েক বছর ধরে দাম বাড়ছে, মান কিছুটা কমেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন