১৯৭২ সালের সংবিধানে সংশোধন, বাতিলের চেষ্টা বা গণভোটের মাধ্যমে ‘রিসেট বাটন’ চাপার যে প্রস্তাব ড. ইউনূস প্রশাসনের সময় উঠেছিল, সে ধরনের উদ্যোগ থেকে বিরত থেকেছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধান রক্ষার অঙ্গীকার করে শপথগ্রহণ করেন। তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এতে সন্তুষ্ট হয়নি। দলটি নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। তবুও অনুষ্ঠানটি ছিল উৎসবমুখর এবং এতে একাধিক রাজনৈতিক বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে।
ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করান।
তারেক রহমান অনেককে চমকে দিয়ে খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। ইউনূস সরকারের সময় তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। পাশাপাশি একজন নারীকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং সমমর্যাদার একজন উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে পরিচিত খলিলুর রহমান গত ১৮ মাস ধরে দেশ-বিদেশে আলোচিত ছিলেন। তাকে তারেকের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে- এমনটি অনেকেই ভাবেননি।
নতুন প্রধানমন্ত্রী অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন দশজন উপদেষ্টা সরাসরি তার অধীনে কাজ করবেন। জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি তরুণ মুখদের অন্তর্ভুক্ত করে প্রজন্মগত ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
২০০৭ সালের জানুয়ারির সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যারা সংস্কারের পক্ষে এবং পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদেরও মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গত ১৫ বছর ধরে তারেক রহমানের লন্ডনকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরোধিতা করা ব্যক্তিরাও দলে জায়গা পেয়েছেন, যা সংঘাতমুখী রাজনীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়।
মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান ও রুহুল কবির রিজভীর মতো জ্যেষ্ঠ নেতাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত না করে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় দেয়া হয়েছে ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য পরিচিত এক রাজনীতিককে। এহসানুল হক মিলনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যা ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় তার আগের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেয়া হয়েছে সালাহউদ্দিন আহমেদকে, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতে নির্বাসনে ছিলেন এবং তার পরিবার অভিযোগ করেছিল যে, তিনি জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছিলেন, পরে সীমান্তের ওপারে তাকে পাওয়া যায়।
অভিজ্ঞ ও নতুন মুখের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রিসভায় গণমাধ্যমবান্ধব জহির উদ্দিন স্বপনকে তথ্যমন্ত্রী করা হয়েছে, যিনি বিস্তৃত যোগাযোগ রক্ষায় দক্ষ হিসেবে পরিচিত। সমালোচকদের মতে, ইউনূস নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের গত ১৮ মাস অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে নিমজ্জিত ছিল। এখন নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সাধারণ মানুষ শান্তি-নিরাপত্তা ও ভয়হীনভাবে রাতে ঘুমানোর নিশ্চয়তা চায়। অনেকে মনে করেন, কার্যকর আইনের শাসনই তা নিশ্চিত করতে পারে।
নতুন প্রশাসন সংবিধান প্রশ্নে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ইউনূস আমলে ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল বা আমূল পরিবর্তনের যে প্রস্তাব উঠেছিল, তার বিপরীতে তারেক রহমানের সরকার শুরু থেকেই বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের শপথ অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নির্বাচনে বিজয়ের পর তারেক রহমান জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান ও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। যা পাশ্চাত্যধারার রাজনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখা হয়েছে। তবুও শপথ অনুষ্ঠানে তাদের অনুপস্থিতি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।
খোলা আকাশের নিচে এই শপথ অনুষ্ঠান শুধু নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক সূচনা নয়, বরং বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাও নির্দেশ করে।
(লেখক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক। মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত।)

JAKIR
৫ মাস আগেBe care full from this types of people.