মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছিলেন কলামিস্ট ই. জ্যাঁ ক্যারল। উল্টো তিনিই আইনের কলে আটকা পড়ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইন মন্ত্রণালয় ক্যারলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এমন একাধিক সূত্র এ কথা জানিয়েছে সিএনএনকে। তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা দুটি দেওয়ানি মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত সাক্ষ্যে ক্যারল মিথ্যা সাক্ষ্য (পারজুরি) দিয়েছেন কি না। এক মামলায় অভিযোগ ছিল, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি নিউইয়র্কের একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ট্রাম্প ক্যারলকে যৌন নিপীড়ন করেন। আরেকটি মামলা ছিল মানহানির। ট্রাম্প ২০১৯ সালে বারবার ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ক্যারল তার ‘উপযোগী নারী’ নন এবং বই বিক্রি বাড়াতে তিনি এসব বানিয়ে বলেছেন।
সূত্রগুলো জানায়, প্রসিকিউটরদের অভিযোগের মূল ভিত্তি হচ্ছে ২০২২ সালে দেয়া ক্যারলের এক জবানবন্দি। সেখানে ৮২ বছর বয়সী ক্যারল বলেছিলেন, তার মামলার জন্য তিনি বাইরের কোনো অর্থায়ন পাননি। কিন্তু পরে জানা যায়, ধনকুবের রিড হফম্যান তার কিছু আইনি খরচ ও ব্যয় বহন করেছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি ক্যারলের আইনজীবীরা। বুধবার হফম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ তদন্তকে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক এবং কিছুটা বিতর্কিত প্রচেষ্টার নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চের অধীনে আইন মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের প্রতিশোধমূলক প্রচারণাকে দ্রুত এগিয়ে নিতে কাজ করেছে। তবে এপ্রিল মাসে বিভাগের দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি যেসব মামলা সামনে এনেছেন, সেগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে এবং আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্ল্যাঞ্চ এই তদন্ত থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কারণ, তিনি আগে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী হিসেবে ক্যারল-সংক্রান্ত আপিল মামলাগুলোতে কাজ করেছিলেন। সূত্রটি আরও জানায়, তদন্ত নিয়ে কোনো বৈঠকে তিনি অংশ নেননি এবং কোনো আলোচনায় জড়িত ছিলেন না। বর্তমানে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের অন্য কর্মকর্তারা তদন্ত তদারক করছেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই তদন্ত শিকাগোর ফেডারেল প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠিয়েছেন বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে। যদিও ক্যারলের জবানবন্দি নিউইয়র্কে হয়েছিল, তবে তার আইনি খরচের অংশ বহনকারী ব্যক্তি হফম্যানের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান শিকাগোতে অবস্থিত। বিচার শুরুর ঠিক আগে হফম্যানের অর্থায়নের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ট্রাম্পের আইনজীবীরা বিস্মিত হন।
২০২২ সালের ভিডিও জবানবন্দিতে ক্যারল তৎকালীন ট্রাম্প আইনজীবী আলিনা হাব্বাকে বলেছিলেন, তার আইনি খরচ অন্য কেউ বহন করছে না। কিন্তু বিচার শুরুর দুই সপ্তাহ আগে ক্যারলের আইনজীবীরা বিচারক ও ট্রাম্পের আইনজীবীদের জানান যে, তারা হফম্যানের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ পেয়েছেন। ক্যারলের আইনজীবীরা বলেন, তিনি কখনো ওই প্রতিষ্ঠানের কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি বা কথা বলেননি। সে সময় আদালতে হাব্বা অভিযোগ করেন, ক্যারলের পক্ষ প্রায় ছয় মাস ধরে সত্য গোপনের ষড়যন্ত্র করেছে।
এরপর বিচারক ট্রাম্পের আইনজীবীদের আবারও ক্যারলকে জবানবন্দিতে প্রশ্ন করার অনুমতি দেন, যদিও সেই জবানবন্দি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। দুই সপ্তাহ পর বিচার শুরু হলে বিচারক লুইস ক্যাপলান বলেন, ক্যারলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তিনি কোনো সমস্যা দেখছেন না। একই সঙ্গে তিনি হফম্যানের অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন করতে আইনজীবীদের বাধা দেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে ক্যারলের এখনো একাধিক আইনি লড়াই চলছে। জুরি বোর্ড ক্যারলকে কোটি কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার রায় দেয়, যার বিরুদ্ধে ট্রাম্প আপিল করেছেন। যৌন নিপীড়নের মামলায় ৫০ লাখ ডলারের রায়ের বিরুদ্ধে ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন এবং ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারের মানহানি মামলার রায়ের বিরুদ্ধেও একই পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আপিল গ্রহণ করবে কি না, সে সিদ্ধান্ত ১২ বার স্থগিত করেছে। সর্বশেষ স্থগিতাদেশ দেয়া হয় বুধবার সকালে। অন্য এক মামলায় ট্রাম্প আইন মন্ত্রণালয়কে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে তিনি দাবি করতে পারেন যে তিনি দায়মুক্তি পাওয়ার অধিকারী। তবে আপিল আদালতের বিচারকদের একটি প্যানেল জানায়, আইনি প্রক্রিয়ার অনেক দেরিতে এই যুক্তি তোলা হয়েছে।
