গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোতে চলমান সংঘাত ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান টেডরোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস। তিনি বলেন, দেশটির পূর্বাঞ্চল বর্তমানে ‘রোগ ও সংঘাতের এক বিপর্যয়ের’ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইটুরি প্রদেশে ইবোলার বিস্তার প্রতিরোধ প্রচেষ্টাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বোমা বর্ষণের মধ্যে আমরা মানুষের আস্থা তৈরি করতে বা আক্রান্তদের বিচ্ছিন্ন রাখতে পারি না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
ইবোলা নিয়ন্ত্রণে প্রচেষ্টা জোরদারের নেতৃত্ব দিতে বুধবার কঙ্গো সফরে যাওয়ার কথা তার। প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর থেকে সেখানে ২২০ জনের সন্দেহজনক মৃত্যু হয়েছে।
ত্রাণকর্মীরা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। খারাপ সড়ক যোগাযোগের কারণে চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সংঘাত ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ইটুরি প্রদেশ ২০২১ সাল থেকে সামরিক শাসনের অধীনে। সেখানে সক্রিয় কয়েক ডজন সশস্ত্র গোষ্ঠী দমনে বেসামরিক প্রশাসনের পরিবর্তে সামরিক জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। টেডরোস বলেন, ওই অঞ্চলে সংক্রমণ বন্ধ করা ‘সম্পূর্ণভাবে মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভর করছে।’ তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘর্ষ ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি সৃষ্টি করছে, আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের ঠাসাঠাসি করে বসবাস করা শিবিরে ঠেলে দিচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করিডরগুলো বিচ্ছিন্ন করছে।
সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মীরা সবকিছু ঝুঁকির মধ্যে রেখে কাজ করছেন, অথচ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ওপর হামলার কারণে রোগী ও তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি সব পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার আহ্বান জানান, যাতে চিকিৎসা দল নিরাপদে কাজ করতে পারে।
ইবোলার সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের কারণে আরও কয়েকটি দেশ কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কঙ্গো, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের বাসিন্দাদের ওপর সাময়িক ৯০ দিনের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে কানাডা। বাহামাসও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার ফলে ওই দেশগুলোর নাগরিকদের কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনে থাকতে হতে পারে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রও এই তিন অঞ্চল ভ্রমণ করা নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
কঙ্গোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ১০০০ মানুষের মধ্যে ইবোলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।
চিকিৎসাসেবামূলক সংস্থা মেডিসিনস সানস ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ)-এর কঙ্গো পরিচালক বিবিসিকে বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। এই প্রাদুর্ভাবটি ইবোলার বিরল এক ধরন বান্ডিবুগিও, যার বিরুদ্ধে এখনো কোনো ভ্যাকসিন বা কার্যকর ওষুধ নেই। কঙ্গোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ২২০ মৃত্যুর মধ্যে এখনো বেশিরভাগের কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি। এ পর্যন্ত মাত্র ১৭ জনের মৃত্যু পরীক্ষাগারে ইবোলাজনিত বলে নিশ্চিত হয়েছে। চিকিৎসকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ৩৬০০ জনকে শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণে রাখা। এ পর্যন্ত প্রায় ২০০০টি পরীক্ষা কিট বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও ৪০০০ কিট পাঠানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একটি অ্যান্টিবডিভিত্তিক পরীক্ষামূলক চিকিৎসাও শিগগির চালু হতে পারে।
কঙ্গোতে এমএসএফ পরিচালক ইওয়াল্ড স্টালস বলেন, চিকিৎসাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংকটকেন্দ্রে পাঠানোর কাজ চলছে। তবে ইটুরি প্রদেশের নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বিবিসিকে বলেন, ধীরে ধীরে কিছু কার্যক্রম চলছে ঠিকই, কিন্তু সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে এখনো পুরো পরিস্থিতির স্পষ্ট চিত্র নেই, আর এর প্রধান কারণ পর্যাপ্ত পরীক্ষা না হওয়া।
