আল-আকসা মসজিদে মুসলিমদের ঈদের নামাজ

স্বস্তি নেই গাজা, লেবাননে

আল-আকসা মসজিদে মুসলিমদের ঈদের নামাজ

ফন্ট সাইজ:

অধিকৃত জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ চত্বরে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করলেন মুসলিমরা। চার দিনের উৎসবের প্রথম দিনে মুসল্লিদের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায় এর প্রাঙ্গণ। হাজারো মুসলিম সেখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। ঈদুল আজহা স্মরণ করিয়ে দেয় নবী ইব্রাহিম (আ.) (খ্রিস্টান ও ইহুদিদের কাছে যিনি আব্রাহাম নামে পরিচিত) আল্লাহর নির্দেশে তার পুত্রকে কোরবানি দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। মুসলিমরা এ দিনে পশু কোরবানি করে নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই আত্মত্যাগ স্মরণ করেন। এ বছরে ঈদুল আজহার উৎসব এসেছে এমন এক সময়ে, যখন অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও ইসরাইল ধারাবাহিকভাবে তা লঙ্ঘন করছে। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় ৮৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ২,৬৪৫ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

চুক্তিটি ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ থামানোর জন্য করা হয়েছিল। সেখানে অক্টোবর ২০২৩ থেকে চলমান যুদ্ধে ৭২,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। প্রায় ১,৭২,০০০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।

দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধের ছায়ায় ঈদুল আজহা

দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে একসময় ঈদুল আজহা মানে ছিল ভরা ঘর, পারিবারিক মিলন এবং শিশুদের আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি ঘোরা। কিন্তু এ বছর অনেক মানুষের জন্য ঈদ এসেছে বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের দীর্ঘ ছাপ নিয়ে। লেবাননের হাশবাইয়া জেলার আরকৌব অঞ্চলে চলমান ইসরাইলি হামলা ও নিরাপত্তা শঙ্কা দৈনন্দিন জীবন বদলে দিয়েছে এবং উৎসবের অনেক ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিয়েছে।

শেবা, কফারহামাম ও মারজ আল-জুউর গ্রামে স্কুলগুলো এখন বাস্তুচ্যুত পরিবারের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক মানুষ উৎসবের সময়েও বাড়ি ফিরতে অনিচ্ছুক। তবুও কেউ কেউ চেষ্টা করছেন ঐতিহ্যের কিছু অংশ ধরে রাখতে- ঈদের মিষ্টি তৈরি করা এবং কাছাকাছি থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হওয়া।

মারজ আল-জুউরের একটি স্কুল, যা এখন আশ্রয়কেন্দ্র, সেখানে ৩৪ বছর বয়সী নাসরিন আবদুল আল তার পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন। তিনি জানান, তারা দক্ষিণ লেবাননের মারজায়উন জেলার আইন আরব গ্রাম থেকে তিনবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তিনি বলেন, সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময় তারা কিছুদিনের জন্য বাড়ি ফিরলেও আবারও তাদের চলে যেতে বলা হয়। বারবার বাস্তুচ্যুতি পরিবার ও শিশুদের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, পরিবার আর একসঙ্গে হয় না, শিশুরাও আর ঈদের পরিবেশ চিনতে পারে না। তিনি আরও বলেন, কৃষকরা ফসল হারিয়েছেন এবং জীবিকা সংকটে পড়েছেন। অনেক পরিবার বাড়ি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।

কফারহামামে ৬০ বছর বয়সী উম নাজিব ফারেস গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা সত্ত্বেও নিজের বাড়ি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিস্ফোরণ এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আর যে ঈদ একসময় সন্তান-নাতি-নাতনিদের মিলনমেলা ছিল, তা এখন কেবল অনুপস্থিতির উৎসবে পরিণত হয়েছে। কফারহামামের মেয়র মুআদ রাহাল বলেন, ঈদুল আজহা সাধারণত পরিবার ও আত্মীয়দের পুনর্মিলনের সামাজিক উৎসব। কিন্তু এখন অনেক বাস্তুচ্যুত পরিবার নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়ে ঈদের সময়েও ফিরতে দ্বিধা করছে। তিনি জানান, কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও প্রায় ১১০টি পরিবার এখনো গ্রামে রয়ে গেছে, যা সীমান্ত অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব সামাজিক শূন্যতা তৈরি করেছে।

শেবা গ্রামে ৮৩ বছর বয়সী রাসমিয়া জঘবি এখনো ঈদের ঐতিহ্যবাহী কুকি বানানোর চেষ্টা করেন, যদিও চারপাশে অনিশ্চয়তার ছায়া রয়েছে। তিনি বলেন, ঈদ হওয়া উচিত কল্যাণ ও প্রার্থনার সময়, যাতে ভবিষ্যতে পরিবারগুলো আবার নিজ বাড়িতে ফিরতে পারে। লেবাননের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২রা মার্চ থেকে ইসরাইল লেবাননে বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। সেখানে প্রায় ৩,২০০ জন নিহত, ৯,৬০০ জনের বেশি আহত এবং ১৬ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি ১৭ এপ্রিল কার্যকর হলেও ইসরাইলি সেনাবাহিনী তা উপেক্ষা করে নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা পরে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন