দেশের রাজনীতিতে ক্রমেই সক্রিয় হয়ে উঠছে ইসলামী দলগুলোর নারী বিভাগ। মাঠের আন্দোলন, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে দলগুলো। জোটভিত্তিক রাজনীতির পাশাপাশি নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছানো এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যেও নারী শাখা ও ছাত্রী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠন ও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে নারীদের মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে আসছে।
নারী নেত্রীরা বলছেন, মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে ইসলামী দলগুলো নারীদের সক্রিয় করছেন না। ইসলামী দলগুলোতে সুষ্ঠু প্রক্রিয়া নেই। নারীদের উঠে আসার মতো প্রক্রিয়া সেখানে নেই। নারীদের সঙ্গে নারীদের রাজনীতি আসলে হয় না। তারা নারীদের সংগঠিত করতে চায় এটা একটি ইতিবাচক ব্যাপার। তবে এটা নারী নেতৃত্ব তৈরি করতে খুব বেশি ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না; যতক্ষণ পর্যন্ত না পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের সুযোগ দেয়া না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত খুব বেশি কিছু হবে না।
ইসলামী দলগুলোর নেতারা বলছেন, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, সাংগঠনিক বিস্তার ঘটানো এবং নারী অধিকার নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সামপ্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ ইসলামী দলগুলোকে নারী সংগঠন শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগী করেছে।
সূত্রমতে, প্রাথমিকভাবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না হলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কয়েকজন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতাকে মহিলা উইংয়ের দায়িত্ব দেয়া হতে পারে। নারী নেতৃত্বে সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যকে সামনে আনার আলোচনা রয়েছে।
জামায়াতের নারী কাঠামো: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরেই সংগঠিত মহিলা উইং পরিচালনা করছে। দলীয় সূত্রের দাবি, জামায়াতের মোট সাংগঠনিক শক্তির বড় একটি অংশ নারী সদস্যদের নিয়ে গঠিত। নারী শাখার কাঠামো সহযোগী সদস্য, কর্মী ও রুকন-এই তিন স্তরে বিভক্ত। দলটির তথ্য মতে, বর্তমানে অর্ধলাখের বেশি নারী রুকন এবং প্রায় চার লাখ কর্মী রয়েছেন। এ ছাড়া সারা দেশে বিপুলসংখ্যক সহযোগী সদস্যও সক্রিয় আছেন।
জামায়াতের সহযোগী সংগঠন ছাত্রীসংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংগঠনটির দাবি, দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তাদের কমিটি রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ নেতাকর্মী ছাত্রীসংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
নির্বাচনী রাজনীতিতেও নারী অংশগ্রহণ বাড়ছে বলে জানিয়েছে জামায়াত। দলীয় তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত নারী আসনে দলটির নারীরা নির্বাচিত হয়েছেন।
ইসলামী আন্দোলনের নতুন ছাত্রী উইং: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সাংগঠনিক বিস্তার বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি এবার আলাদা ছাত্রী উইং গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ঈদুল আজহার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারে। দলটির নেতারা বলছেন, নতুন প্রজন্মের নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের উপযোগী কর্মসূচির মাধ্যমে সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, ইসলামী আন্দোলনের নারী বিভাগ ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পর থেকে আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করে। তবে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হওয়ায় এবার আলাদা ছাত্রী সংগঠন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এসব বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর মহিলা উইংয়ের প্রচার সম্পাদক নাজমুন নাহার নীলু মানবজমিনকে বলেন, দেশে নারীর সংখ্যা প্রায় ৫১ শতাংশ। তাই নারীদের বাদ দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলই কার্যকরভাবে এগোতে পারে না। সে কারণে সব দলই নারীদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা নিতে পারে, এটি ইতিবাচক দিক।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীতে নারীদের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নারীরা সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত আছেন। তবে বর্তমানে তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। আগে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত থাকলেও এখন দলীয় ও জোটগতভাবে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বেড়েছে।
এনসিপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ‘জাতীয় নারীশক্তি’র আহ্বায়ক মনিরা শারমিন মানবজমিনকে বলেন, ইসলামী দলগুলোতে সুষ্ঠু প্রক্রিয়া নেই। নারীদের উঠে আসার মতো প্রক্রিয়া সেখানে নেই। নারীদের সঙ্গে নারীদের রাজনীতি এটা আসলে হয় না। ইসলামী দলগুলো যেভাবে ইসলামী আইনের মধ্যদিয়ে চলে সেভাবে নারীদের উঠে আসার মতো খুব বেশি সুযোগ নেই। তারা নারীদের সংগঠিত করতে চায়- এটা একটি ইতিবাচক ব্যাপার। এটা নারী নেতৃত্ব তৈরি করতে খুব বেশি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি না।
বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ মানবজমিনকে বলেন, ৫ই আগস্টের পর আমাদের মহিলা উইং নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে। এখন আমরা ছাত্রীদের জন্য আলাদা সংগঠন করার চিন্তাভাবনা করছি। কারণ, বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রীরা আধুনিক নানা চিন্তা ও বৈশ্বিক ধারার সঙ্গে পরিচিত। তারা যেন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারে, সেই জায়গা থেকেই উদ্যোগটি নেয়া হচ্ছে। আমরা পাঁচ ধরনের কর্মসূচির প্রস্তাব করেছি। এগুলো হলো- জ্ঞানচর্চা, উন্নয়ন, দাওয়াত, সমাজকল্যাণ ও নেটওয়ার্কিং। বিশেষ করে নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।
রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে শেখ ফজলুল করিম মারুফ বলেন, এখানে রাজনীতি বলতে শুধু মিছিল-মিটিং বোঝানো হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাজনীতি বলতে নীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে সচেতন আলোচনা এবং বিভিন্ন পলিসি নিয়ে সংলাপকে বোঝায়। আমাদের ছাত্রীরাও সেই ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণের জায়গায় কাজ করবে।
