পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র তিনদিন বাকি থাকলেও চট্টগ্রামের কোরবানির পশুর হাটগুলোতে এখনো কাঙ্ক্ষিত প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসেনি। হাটে পর্যাপ্ত গরু-ছাগল উঠলেও বিক্রি চলছে ধীরগতিতে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে দু’টি অস্থায়ী পশুর হাট এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় আরও পাঁচটি বাজার ইজারা দিয়েছে। পাশাপাশি নগরীতে চসিকের তিনটি স্থায়ী পশুর বাজারও চালু রয়েছে।
অস্থায়ী বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্ণফুলী পশু বাজারের নুর নগর হাউজিং এলাকা এবং মুসলিমাবাদ রোডের সিআইপি জসিমের খালি মাঠ। সাগরিকা, মইজ্জ্যারটেক ও পাহাড়তলীসহ বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, পশুর সংখ্যা পর্যাপ্ত কিন্তু ক্রেতার উপস্থিতি কম। অনেকেই শুধু ঘুরে ঘুরে দাম জেনে ফিরে যাচ্ছেন। চট্টগ্রাম নগরীর অস্থায়ী গরুর বাজার ইলিয়াস ব্রাদার্স মাঠে দেখা যায়, হাট জুড়ে গরু-মহিষসহ বিভিন্ন ধরনের পশু। তবে ক্রেতাদের আনাগোনা তেমন ছিল না বলেই চলে। পশুর দাম নিয়ে দেখা যায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ক্রেতারা পশুর দাম-দর করলেও বেচাকেনা তেমন জমে উঠেনি। অধিকাংশ ক্রেতা মাঝারি আকৃতির গরুর দাম হাঁকলেও তাদের চোখ জুড়াচ্ছে বড় আকৃতির পশুগুলো। যাদের এক একটির দাম বিক্রেতারা হাঁকছেন ৪ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। এর বিপরীতে প্রাপ্যতা রয়েছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি পশু। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৫ লাখ ৪৭ হাজার ১১৩টি এবং ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য পশু ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮টি। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামে ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯টি এবং ২০২৩ সালে ছিল ৮ লাখ ৪২ হাজার ১৬৫টি। সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে কিছুটা কমে চলতি বছর উৎপাদন ৭ লাখ ৮৩ হাজারে নেমে আসে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে প্রতিপালিত পশুর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯৯টি ষাঁড়, ৯০ হাজার ৪৮৮টি বলদ, ৩৩ হাজার ৭৯২টি গাভী, ৪৭ হাজার ৮৩৪টি মহিষ, ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি ছাগল, ৪১ হাজার ৪২৩টি ভেড়া এবং অন্যান্য ৯৬টি পশু।
তথ্যে আরও দেখা যায়, চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চল ও উপজেলাগুলোতে পশু উদ্বৃত্ত থাকলেও নগর এলাকায় ঘাটতি বেশি। উপজেলাগুলোর মধ্যে মিরসরাইয়ে ৬ হাজার ৫১০টি, সন্দ্বীপে ১১ হাজার ৬০৪টি, সীতাকুণ্ডে ৩ হাজার ২৩০টি, ফটিকছড়িতে ৭ হাজার ৮১৮টি এবং লোহাগাড়ায় ৬ হাজার ৯৭৬টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এ ছাড়া বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। অন্যদিকে, নগরীর পাঁচলাইশ এলাকায় ৩০ হাজার ১৫২টি, কোতোয়ালিতে ৩১ হাজার ১৫৮টি এবং ডবলমুরিং এলাকায় সর্বোচ্চ ৪৭ হাজার ২০টি পশুর ঘাটতি রয়েছে।
হাট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্রেতা ও বিক্রেতার নিরাপত্তায় ২৪ ঘণ্টা পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার ও সিভিল পোশাকে নজরদারি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রায় ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক মাঠে কাজ করছেন। বোয়ালখালী থেকে এক কিলোমিটার হাটে গরু কিনতে আসা ইসতিয়াক ফাতিন বলেন, ‘৫০-৬০ হাজার টাকার গরু এখন ৮০-৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। তাই আমরা এখনই কিনছি না।’ বিবিরহাট হাটে আসা ক্রেতা মো. খোরশেদ বলেন, একদিকে গরুর দাম বেশি, অন্যদিকে হাসিলও বেশি নেয়া হচ্ছে।
কর্ণফুলী এলাকার গরু খামারি মো. আসাদ বলেন, উৎপাদন কমার পেছনে মূল কারণ গো-খাদ্য, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়া। গো-খাদ্য ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন। এর খেসারত দিচ্ছেন ছোট খামারিরা।
বিবিরহাট হাটের ইজারাদার পক্ষের প্রতিনিধি রবিউল আওয়াল জানান, সরকার নির্ধারিত ৭.৫ শতাংশের পরিবর্তে তারা ৫ শতাংশ হাসিল নিচ্ছেন। পাশাপাশি সিসিটিভি, ব্যাংক বুথ ও এটিএম সুবিধাসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, গ্রামাঞ্চলের উদ্বৃত্ত পশু শহরে সরবরাহ হচ্ছে।
এ ছাড়া দেশে বর্তমানে ২২ লাখের বেশি কোরবানির পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। ফলে, দেশীয় পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে এবং ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম হাঁকানোর সুযোগ পাবে না। তিনি আরও জানান, নাটোর, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতি বছরই কোরবানির পশু আসে।
