সিলেটে হাম উপসর্গে মৃত্যুর লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। শনিবারও ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৪ শিশু। দু’দিনের হিসাবে মারা গেছে ৯ জন। সব মিলিয়ে ৫১ জনে দাঁড়ালো মৃত্যুর সংখ্যা। পিআইসিইউ রোগীতে ভর্তি। স্থান সংকুলান হচ্ছে না। হামের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। এই অবস্থায় পরিস্থিতি আতঙ্কজনক পর্যায়ে পৌছার সম্ভাবনা দেখা
দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন; ঈদ পরবর্তী দু’সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। এরই মধ্যে হামের টিকা দেয়ার এক মাসের কর্মসূচি শেষ হয়েছে। এই টিকাদান কর্মসূচি হিমোউনিটি বাড়াবে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হামের জন্য বিশেষায়িত শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া ৪ শিশুর মধ্যে ২ জন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের একজনের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলায় এবং অন্যজনের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। একই সময়ে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়। যাদের একজন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার এবং অন্যজন সদর উপজেলার বাসিন্দা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী চলতি বছর সিলেট বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৪ জন এবং উপসর্গ নিয়ে আরও ৪৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১৫৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৯৫ জন রোগী। এর মধ্যে হামের জন্য বিশেষায়িত শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ১০৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান মানবজমিনকে জানিয়েছেন, হামের মৃত্যু ও আক্রান্ত ঠেকাতে গেলে একমাত্র পথই হচ্ছে টিকা। আর টিকাদান কর্মসূচি সফল হলেই হাম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। এ জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। টিকাদান কর্মসূচি শেষ হয়েছে। শিশুদের মধ্যে হিমোউনিটি সঞ্চয় হলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। এদিকে, টিকা কর্মসূচি সফল নিয়ে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। সূত্র বলছে, করোনার মতো এবার হামেও তছনছ হচ্ছে সুনামগঞ্জ। ওখানে টিকাদান গ্রহণের হার সবচেয়ে কম। এ ছাড়া সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকাতে ঠিকাদান কর্মসূচিতে সফলতা কম। যেসব এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি সফল হয়নি সেখান থেকেই হাম আক্রান্ত রোগী বেশি আসছে। পরিসংখ্যান বলছে, সিলেট নগরে হাম আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে কম।
কারণ; নগরে টিকাদান কর্মসূচি সবচেয়ে বেশি সফল। অন্যদিকে সিলেট জেলায়ও ৯৭ ভাগ ঠিকাদান কর্মসূচি সফল হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. নাসির উদ্দিন। ফলে সিলেট জেলাতেও দিন দিন রোগী কমছে। টিকা গ্রহণের সবচেয়ে কম হার হচ্ছে সুনামগঞ্জে। সেখানে ৭৭ ভাগ শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। অন্যরা টিকা গ্রহণের বাইরে রয়েছে। এজন্য অভিভাবকদের অসচেনতাকে দায়ী করা হয়েছে। সিলেট ওসমানী ও শামসুদ্দিন হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম উপসর্গ বা আক্রান্ত হয়ে এখন সবচেয়ে বেশি শিশুই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। যাদের বয়স ১০ মাসের নিচে। যারা মারা যাচ্ছে তাদের বয়সও এক বছরের নিচে। মৃত্যুর ৮০ ভাগ শিশুই টিকা গ্রহণ করেননি। এর বাইরে মায়ের অপুষ্টিজনিত সমস্যা রয়েছে।
এসব কারণে অসচেতন অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে হাসপাতালমুখী বেশি হচ্ছেন। সিলেট বিভাগের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় হাম উপসর্গ ও আক্রান্তের হার বেশি। মৃত্যুর হার বেশি। ভোগোলিক অবস্থানের কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি না পৌঁছার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদ হোসেন মানবজমিনকে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য বিভাগ এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য টিকাদান কর্মসূচিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
সুতরাং টিকাদান কর্মসূচি সফল হয়েছে। এখন যারা বাদ পড়েছে তাদের টিকা দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ঈদ মৌসুম পর্যন্ত সিলেটে হামের ঊর্ধ্বগতি থাকতে পারে। আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। যে টিকা দেয়া হয়েছে তার তো একটা প্রভাব তো পড়বে বলে জানান তিনি।
