রাজধানীর মিরপুরে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু রামিসার বিচার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। বিভিন্ন ব্যানারে তারা অংশগ্রহণ করেন। জুমার নামাজের পর এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন। পরে তারা মিছিল বের করে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। এতে কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১১টার পর থেকে রামিসাদের বাসার সামনের গলিতে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন মানুষ প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ করেন।
একই দাবিতে জুমার নামাজের পর একটি বিক্ষোভ মিছিল মিরপুর থেকে বেরিয়ে রামিসার বাসার সামনে গিয়ে শেষ হয়। বেলা সোয়া ২টা থেকে ভুক্তভোগীর বাসার কাছে মানববন্ধনের আয়োজন করে বি-১১ সমাজকল্যাণ যুব সংগঠন ও রামিসার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এতে আয়োজকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও অংশ নেন। এ ছাড়াও বেলা পৌনে ৩টা থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ‘এলাকাবাসীর ব্যানারে’ কয়েকশ’ মানুষ জড়ো হয়ে শিশু হত্যাকারীর ফাঁসির দাবি ও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা বারবার ঘটছে। এজন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যাতে এমন অপরাধ করার আগে হৃদয় কেঁপে ওঠে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, দুপুর ১২টার দিকে শিশু রামিসা হত্যা ও ধর্ষণের প্রতিবাদে আসামিদের বিচারের দাবিতে স্থানীয় জনতা মিরপুর-১০ নম্বর সড়কে অবস্থান নেয়। বিক্ষোভাকারীদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ ছিলেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ও একই দাবিতে মিরপুর-১০ থেকে ১২ নম্বর পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করা হয়। এতে ওই এলাকায় দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এদিন রাত পৌনে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকে রামিসার বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন।
আসামি সোহেল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল: এদিকে, শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা আগেও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। তার অতীত কর্মকাণ্ড ভালো ছিল না। গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এ কথা বলেন। তিনি বলেন, শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডে দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে জমা দেয়া হবে। প্রধান অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা এর আগেও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। অতীত কর্মকাণ্ড ভালো ছিল না। তার স্বভাব-চরিত্র খারাপ ছিল।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার বাসা থেকে বের হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন। মা, বাবা এবং তার বড় বোন উপস্থিত ছিলেন, সান্ত্বনা দিয়েছেন। আমরা আশ্বস্ত করেছি, পুলিশ ডিপার্টমেন্ট দ্রুততার সঙ্গে আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। আসামি ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ?এখন চার্জশিট দেয়ার পালা। তিনি বলেন, চার্জশিট দেয়ার আগে ডিএনএ টেস্টটা করতে হবে। ডিএনএ টেস্টের জন্য সিআইডি ল্যাবে অলরেডি আদালতের অনুমতি নিয়ে চেষ্টা চলছে। ডিএনএ টেস্টের নিয়ম হচ্ছে যে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে, যেহেতু এটা বৈজ্ঞানিক বিষয়। সেটা শেষ হবে রোববারের দুপুরের মধ্যে। রোববারের মধ্যে ইনশাআল্লাহ্ আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে পারবো এবং তারপর অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে বিচার কার্য নিষ্পন্ন হয় সে চেষ্টা করবো। যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায় সেজন্য আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
আসামিকে আইনি সেবা না দেয়ার ঘোষণা ঢাকা আইনজীবী সমিতির: রামিসা হত্যা মামলায় আসামিপক্ষে ঢাকা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য আইনি সেবা প্রদান করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কালাম খান এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কার্যনির্বাহী কমিটি জুম মিটিং শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় আসামিপক্ষে সমিতির কোনো সদস্য অংশ নেবে না। ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূইয়া জানান, নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে অত্যন্ত ঘৃণিত ও গুরুতর অপরাধ করেছে। আমরা চাই সমাজে এইসব অপরাধের জন্য জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হোক। এসব কারণে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কোনো আইনজীবী আসামিপক্ষে অংশ নেবেন না।
