হামের পিক টাইম

সিলেটে যে কারণে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

ফন্ট সাইজ:

সিলেটে হামের পিক টাইম চলছে। এটিকে চিকিৎসকরা ব্যাখ্যা করছেন এই ভাবে। কোনো ভাইরাস ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়লে এবং সংক্রমণ বেশি হলে তখনই বলা হয় ‘পিক টাইম’। বর্তমানে সিলেট অঞ্চলে হামের এই অবস্থা চলছে। ফলে মৃত্যুর মিছিল চলছে। আর উপসর্গ নিয়ে বেশি মৃত্যু হচ্ছে। শুক্রবার সিলেটে মারা গেছে ৫ শিশু। এই মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চিকিৎসকদের একটি জোরালো দাবি হচ্ছে; সরকারি হাসপাতালেই হচ্ছে সব মৃত্যু। এ পর্যন্ত সিলেটে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় সব মৃত্যুই হচ্ছে এসডিএই ও পিআইসিইউতে। অর্থাৎ মুমূর্ষু অবস্থায় গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন শিশুরা। এ জন্য তারা দায়ী করছেন অভিভাবকদের।

বলছেন; উপসর্গ নিয়ে অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হন না। যখন শিশুটির অবস্থা ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায় তখন তারা হাসপাতালে আসেন। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে নিয়ে যান। অনেককেই সেক্ষেত্রে বাঁচানো সম্ভব হয় না। আবার অনেক বেসরকারি হাসপাতালে এরই মধ্যে হামের আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছে। ওই সব হাসপাতালে এখনো পিআইসিইউ বা এসডিইউ খোলা হয়নি। ফলে কোনো রোগী ক্রিটিক্যাল হলেই তাকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিলেট বিভাগের সরকারি পর্যায়ে এসডিইউ ও পিআইসিইউ’র সুবিধা কেবল সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে রয়েছে। এ দু’টি হাসপাতালে প্রায় ৩৪টি এসডিইউ ও পিআইসিইউ রয়েছে। ফলে বিভাগের অপর তিন জেলা বা উপজেলা হাসপাতালে আইসোলেশনে থাকা কোনো রোগীর পিআইসিইউ সুবিধা পেতে হলে কয়েক ঘণ্টা জার্নি করে দূরবর্তী স্থান সিলেটে এসে এই সুবিধা নিতে হয়। এতে অনেক রোগীর অবস্থা পথিমধ্যেই অবনতি হয়ে যায়।

এ ছাড়া প্রায় সময় দু’টি হাসপাতালের এসডিইউ ও পিআইসিইউ’র বেড খালি পাওয়া যায় না। ফলে রোগীকে সাধারণ বেডে রেখেই অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়। এতে করে অনেক রোগীই গুরুতর পর্যায়ে চলে যায়। গতকাল শামসুদ্দিন হাসপাতালে পিআইসিইউতে থাকা শিশু রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন- অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চল থেকে পিআইসিইউ’র সুবিধা নিতে সিলেটে এসেছেন। আসতে আসতেই শিশুর অবস্থা আরও গুরুতর হয়। এজন্য তারা জেলা হাসপাতালে সেই সুবিধা বাড়ানোর দাবি করেন।

যদি সিলেট বিভাগের অপর তিন জেলায় এই সুবিধা থাকে তাহলে অনেক রোগীকেই বাঁচানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন তারা। শিশু মৃত্যুর জন্য বিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াকে দায়ী করেছেন হামের জন্য বিশেষায়িত শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন- রোগী যখন ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায় তখনই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন হয়তো পিআইসিইউ খালি নয়। এ জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়। এ জন্য উপসর্গ দেখা দিলেই যেন হাসপাতালে রোগী ভর্তি করা হয়। এতে অভিভাবকরা সচেতন হলে রোগী মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব বলে জানান তিনি। এ ছাড়া- শিশুর হিমোনিটি সমস্যা এবং অভিভাবকরা ভ্যাক্সিনেটেড না থাকার কারণে শিশু হামে আক্রান্ত হয় বলে জানান তিনি। সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. নাসির উদ্দিন মানবজমিনকে জানিয়েছেন- পিআইসিইউ সুবিধা হঠাৎ করে বাড়ানো যায় না। এজন্য আনুষঙ্গিক সাপোর্ট লাগে। তবে সিলেটে এসডিইউ ও পিআইসি সুবিধা পর্যাপ্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।

মারা যাওয়া শিশুদের পরিচয়: শুক্রবার সিলেটে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সিলেট জেলায় একজন, সুনামগঞ্জে ৩ জন ও হবিগঞ্জে ১ জন। এরা হচ্ছে- হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের আব্দুল মালিকের ৫ মাস বয়সী মেয়ে রাইসা, সুনামগঞ্জের ছাতকের ইশাক আলীর ৬ বছর বয়সী ছেলে আলী আফসান, দিরাইর মুসাদ্দিক মিয়ার ১০ মাস বয়সী মেয়ে মুসলিমা, সদরের ৪ বছর ২ মাস বয়সী শামিমা ও সিলেট সদরের বাহরাম আহমেদের ১ বছর ২ মাস বয়সী ছেলে মো. রাশেদ আহমেদ। তাদের মধ্যে রাইসা ও আলী আফসান সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, মুসলিমা ও রাশেদ সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে এবং সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে শামিমা মারা যান। ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৪ রোগী।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ২৮৩ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৮০ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৯ জন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৫৫ জন ভর্তি আছে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৪ জন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১৯ জনসহ বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন