১৫-২০ জনের মিছিলের মামলায় আসামি দেড় শতাধিক! সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ওই মামলার আসামি তালিকায় আছে বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকদের নামও। বিএনপি নেতার এক শিশু সন্তানও বাদ পড়েনি মামলা থেকে। ফাঁসানো হয়েছে নিরপরাধ আরও অনেককে। আর এসব কারণে সরাইলে ব্যাপক আলোচনায় এ মামলা। এলাকার সংসদ সদস্যও মুখ খুলেছেন এ নিয়ে। মামলা নিয়ে ক্ষোভ আছে বিএনপিতেও। পুলিশ বলছে, যাদের আসামি করা হয়েছে তারা কাউকে চেনেন না। প্রত্যেক এলাকার স্থানীয় বিএনপি’র নেতৃবৃন্দের দেয়া তালিকা অনুসারে আসামি করা হয়েছে। তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত ব্যক্তিরা মামলা থেকে বাদ যাবেন। কিন্তু তদন্তের আগেই মামলার এফআইআর করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ বাদী হয়ে এমন ঘটনা বিরল।
যুবলীগের এক মিছিলকে কেন্দ্র করেই হয়েছে এ মামলার উৎপত্তি। পুলিশ এবং বিভিন্ন সূত্র জানায়, গত ১৭ই মে ভোরে সরাইলের শাহবাজপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তিতাস ব্রিজের পূর্ব পাশে যুবলীগের একটি ঝটিকা মিছিল হয়। যুবলীগ নেতা শেখ মুন্নার নেতৃত্বে ওই মিছিলে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ জন অংশ নেন। মিছিলের ২ মিনিটের একটি ভিডিও মুন্নার ফেসবুকে আপলোড করা হয়। এরপরই ফুঁসে উঠেন সরাইল বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রশাসনকে দায়ী করে তারা ফেসবুকে লিখতে শুরু করেন। প্রতিবাদে ওইদিন সন্ধ্যায় উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক রিফাত বিন জিয়া, ছাত্রদল নেতা ওয়ালিদ, স্বপন ও তপনের নেতৃত্বে সরাইল সদরে একটি বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলকারীরা একপর্যায়ে থানার প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে শেখ মুন্নাসহ তার দোসরদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান। পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। প্রতিবাদ মিছিল করেছে উপজেলা জামায়াতে ইসলামও। ওই রাতেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে এসআই বখতিয়ার বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় এজাহারনামীয় আসামি করা হয় ১৩৯ জন। আর অজ্ঞাতনামা আসামি ১৫-২০ জন। বিশাল নামের এক ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলায় আসামি হয়েছেন উপজেলার বর্তমান ও সাবেক ১০-১১ জন জনপ্রতিনিধি। বাদ পড়েনি বিএনপি নেতার শিশু সন্তান আলভিও।
উপজেলা কৃষক দলের সাবেক সহ-সভাপতি শাহাজাদাপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. তাজুল ইসলামের দুই ছেলেকে আসামি করা হয়েছে। বড় ছেলে আকাশ মিয়া (২৬) ঢাকার সাভারে একটি চায়না কোম্পানিতে কর্মরত। ঘটনার দিনে ও সময়ে অফিসে থেকেও তিনি অভিযুক্ত (১০৩ নম্বর)। ছোট ছেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আরাফাত রহমান (১৮) এ মামলার ৫ নম্বর আসামি। তাজুল ইসলাম বলেন, ইউনিয়নে বিএনপি’র জন্মদাতা কয়েকজনের আমি একজন। জীবনভর এই দলের জন্য কাজ করে গেলাম। গোটা পরিবার বিএনপি। আজকে ওই দলের মামলায় আমার দুই ছেলে গায়েবি আসামি। এসব বিষয়ে ক্ষুব্ধ হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি তার নিজের ফেসবুক ভেরিফায়েড আইডিতে লিখেন- ‘ভুয়া মামলা দিচ্ছেন, বাণিজ্য করছেন, করতে থাকেন। পরিণতির জন্যও প্রস্তুত থাকবেন দয়া করে।’
ঢাকার একটি সভায় তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ১৫-২০ জন মিছিল করলো। তাদের মুখে ছিল মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ। এমন অবস্থায় কাউকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা অসম্ভব। সেখানে দেড় শতাধিক লোকের বিরুদ্ধে মামলা। মূল বিষয় হলো কিছু নেতা পুলিশের সঙ্গে মিলে বাণিজ্য করবেন। মামলার আগেই ফোন করে বলেন, আসামি হয়ে যাবা। বাঁচতে হলে টাকা দাও।’ সূত্র জানায়, শুধু শাহজাদাপুর ইউনিয়নেই এই মামলায় আসামি করা হয়েছে বর্তমান ও সাবেকসহ মোট ৭ জন ইউপি সদস্যকে। এরা হলেন- লুতু মিয়া, আপন, হরিবিলাশ, অমরেশ, জুয়েল, আবুল হক ও মফিল মিয়া, সরাইল সদর ইউপি সদস্য রনি, কালীকচ্ছের সাবেক ইউপি সদস্য আলী মিয়া ও ফুল মিয়া। এ ছাড়া দেওড়া গ্রামের দল নিরপেক্ষ সামাজিক ব্যক্তিত্ব ব্যবসায়ী মো. আরমান মোল্লাকে আসামি করায় অবাক সেখানকার বিএনপি’র সমর্থকরা। হতবাক গ্রামবাসীও।
আরমান কোন দলের মিটিং-মিছিলে যান না। শাহজাদাপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. আক্তার হুসাইন ভূঁইয়া তার ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, ‘আমার এক ছাত্রদলের কর্মীকে ছাত্রলীগ বানিয়ে মামলা দেয়া হলো। তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। নিরীহ জনগণকে মামলা দিয়ে হয়রানি করার মানে হয় না। সরাইল উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক রিফাত বিন জিয়া বলেন, প্রতিবাদ মিছিলের পর ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি ওসি মহোদয়কে বলে দিয়েছেন ওই মিছিলে থাকা ১৫-২০ জনের নামে মামলা দাও। কিন্তু তিনি কেন ১৩৯ জনের নামে মামলা দিলেন বুঝলাম না। প্রতিষ্ঠিত অনেক আওয়ামী লীগার আসামি হয়নি। আবার একনিষ্ঠ বিএনপি’র নেতার কিশোর ছেলে আসামি। এতে করে আমাদের দল ও সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ১৬টি বছর দলের আন্দোলনে সংগ্রামে সামনের সারিতে ছিলাম। অনেক জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করছি।
এভাবে আমাদের দলকে সমালোচনায় ফেলার জন্য নয়। উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও যুবদলের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. হানিফ আহমেদ বলেন, মিছিল করেছে সর্বোচ্চ ২০ জন। আসামি হয়ে গেল ১৫৯ জন। এ তো দেখছি ফ্যাসিস্ট আমলের কাণ্ডের মতো। এই দালালগুলো কারা- এদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। শাহজাদাপুর ইউপি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও যুবদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ছাত্রজীবন থেকে বিএনপি’র রাজনীতি করে আসছি। হামলা-মামলায় জীবনটা জর্জরিত। আজ নিষিদ্ধ সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলায় আমার শিশুপুত্র আলভিকে আসামি (৩৪ নম্বর) করে জীবনের শুরুতেই দাগ লাগিয়ে দিলেন। এটাই কি আমার প্রাপ্তি?
সরাইল উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি মো. আনিছুল ইসলাম ঠাকুর বলেন, আমি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ওইদিনের মিছিলের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করছি। আমার দল বিশ্বাস করে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা বা মামলা করবেন। এ কাজে আমরা হস্তক্ষেপ করবো কেন? অতিউৎসাহী হয়ে বিএনপি’র নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা ফায়দা লুটার চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হোক। নিরপরাধ ও নির্দোষ লোকদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হোক। মামলার বিষয়ে সরাইল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, আমরা এখানে নতুন। সবাইকে চিনি না। স্থানীয় বিএনপি’র নেতৃবৃন্দের দেয়া তালিকায় আসামি করা হয়েছে। তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হলে মামলা থেকে বাদ যাবেন।
