কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় প্রধান সন্দেহভাজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মো. জাহিদুজ্জামানের অবস্থান নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। মামলার নাটকীয় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ আসামি জাহিদ এখন কোথায় আছেন- এই প্রশ্ন জোরালো হয়ে দেখা দিয়েছে সর্বমহলে। কলেজছাত্রী তনু হত্যার সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসের ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে দায়িত্বরত ছিলেন। তার দুই মেয়েকে পড়াতেন কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। সেখানে টিউশনি করতে যাওয়ার পর তনু ফিরেছিলেন লাশ হয়ে। রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউজ এলাকার কালা ট্যাঙ্কি-সংলগ্ন কালভার্টের পাশের পশ্চিম দিকের ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মো. জাহিদুজ্জামানের বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের গড়ঘাটা গ্রামে। তার বাবা মৃত নাসির উদ্দিন সরদার। ১৯৭৮ সালে জন্ম নেয়া জাহিদুজ্জামানের বর্তমান বয়স ৪৮ বছর। স্থানীয় সূত্র জানায়, সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়ার পর জাহিদুজ্জামান আর গড়ঘাটায় যাননি। সেখানে তাদের পৈতৃক জমিজমা বিক্রি করে পরিবারটি অন্যত্র চলে গেছে। জাহিদুজ্জামান খুলনায় বাড়ি করেছেন এবং সেখানেই বসবাস করেন বলে এলাকাবাসীর ধারণা। মোড়েলগঞ্জ উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের গড়ঘাটা ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাসিব শেখ জানান, জাহিদের বাবা নাসির উদ্দিন সরদার প্রায় ৬-৭ বছর আগে মারা গেছেন। তার মা একজন ধর্মপ্রাণ নারী। বাবা নাসির উদ্দিন ছিলেন গৃস্থ। জাহিদরা চার ভাই। অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহিদের ভাই মিজানের ভোলপুর বাজারে একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। বাজারের পাশেই তিনি বাড়ি করেছেন।
আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান বর্তমানে কোথায় আছেন, তা জানতে তার ব্যবহৃত নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তিনি দেশে আছেন কিনা, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য মেলেনি। এমনকি তনু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি তদন্তকালে প্রাপ্ত তিন সাবেক সেনাসদস্যের নাম কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে দাখিল করেছেন। সেখানে মো. জাহিদুজ্জামানের নাম এক নম্বরে রয়েছে। তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য আদালত অনুমতি দিয়েছেন এবং তদন্ত কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানিয়েছেন।
তিনি আদালতে মো. জাহিদুজ্জামানের বহির্গমন ও আগমনের সময় আটক এবং তার সম্পর্কে তথ্য প্রদানের জন্য অনুমতি চান। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, আমরা তদন্ত করে দেখছি তিনি কোথায় আছেন, জানার চেষ্টা করছি। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন জানান, সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় আমার মেয়ে টিউশনি করতে গেছে। আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, তা তারাই বলতে পারবে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য ঘটনার পর থেকেই বলে আসছি।

NADIM AHAMMED
২ মাস আগেবর্তমান অবস্থান: অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহিদুজ্জামানের পৈত্রিক নিবাস বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের গড়ঘাটা গ্রামে। তবে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি আর গ্রামে ফিরে যাননি এবং সেখানে তাদের পৈত্রিক জমিজমা বিক্রি করে তার পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। বর্তমানে তিনি খুলনায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বলে তার গ্রামের বাসিন্দারা জানান।
তদন্তের নতুন মোড় ও তল্লাশি: পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সম্প্রতি মামলাটির তদন্তে ব্যাপক জোর দিয়েছে। এপ্রিল ২০২৬-এ ঢাকা থেকে অপর সন্দেহভাজন সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতারের পর, সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলমকে গ্রেপ্তারে পিবিআই বর্তমানে দেশজুড়ে জোর তৎপরতা ও অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
ডিএনএ পরীক্ষা: ২০১৭ সালে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে ৩ জন পুরুষের শুক্রাণুর নমুনা পেয়েছিল এবং সম্প্রতি পিবিআই আরও ১ জনের রক্তের আলামতসহ মোট ৪ জনের ডিএনএ উপস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছে। এই ডিএনএ ক্রসম্যাচিং বা মেলানোর তালিকায় সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামানের নাম অন্যতম প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে রয়েছে।
তনুর পরিবার শুরু থেকেই সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় টিউশনি করতে যাওয়ার পর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করে আসছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলার তদন্তের স্বার্থে এবং তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য জাহিদুজ্জামানের সঠিক অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্তের চেষ্টা করছে।