শিল্প উন্নয়নের এই যুগে আমরা প্রকৃতি ধ্বংস করে নানা ধরনের শিল্পকারখানা নির্মাণ করছি, প্রকৃতির পাশাপাশি যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে আমাদের অর্থনীতির উপরও। আধুনিক অর্থনীতিবিদরা প্রকৃতির সঙ্গে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র আবিষ্কার করেছেন। তারা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতির সঙ্গে পরিবেশকে সম্পৃক্ত করার এই নতুন ধারণাকেই বলা হচ্ছে ‘সবুজ অর্থনীতি।’
সহজভাবে বলা যায়, প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই সবুজ অর্থনীতি। এটি এমন এক নিরাপদ অর্থনীতি যা মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে এবং একই সঙ্গে পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি করবে না, পরিবেশগত বিভিন্ন ঝুঁকি কমাবে এবং অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করবে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য এটি কেবল পরিবেশ রক্ষার উপায় নয় বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি।
২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থাটি প্রতিবেদনটির শিরোনাম দিয়েছিল, ‘ক্রিয়েটিং আ গ্রিন অ্যান্ড সাসটেইনেবল গ্রোথ পাথ ফর বাংলাদেশ।’ এ প্রতিবেদন বলছে, পরিবেশের অবনমনের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশ ৬৫০ কোটি ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। যা বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি’র প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশ সংঘটিত হয় পানি এবং বায়ুদূষণের কারণে। সর্বাধিক দূষিত ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম। পরবর্তীতে এই তালিকায় বাংলাদেশের আরও অবনমন ঘটে।
বিশ্বব্যাংকের আরেক প্রতিবেদন মতে, ২০১৯ সালে পরিবেশ দূষণের কারণে স্বাস্থ্যখাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪.৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপি’র প্রায় ১৭.৩ শতাংশ। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রণীত ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (২০২২) অনুযায়ী ২০১২ সালে বাংলাদেশে সর্বমোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ছিল ১৬৯.০৫ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান জ্বালানি খাতের ৫৫.০৭ শতাংশ, এরপরে আছে কৃষি, বনভূমি ও জমির ব্যবহারসংক্রান্ত ২৭.৩৫ শতাংশ, বর্জ্য তৈরির মাধ্যমে ১৪.২৬ শতাংশ ও শিল্প খাত ৩.৩২ শতাংশ। এই ডকুমেন্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ২০১২ সালের ১৬৯.০৫ মিলিয়ন টন থেকে ২০৩০ সালে ৪০৯.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছানোর কথা; যার মধ্যে ৩১২.৫৪ মিলিয়ন টনই জ্বালানি খাতে।
বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শর্তহীনভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৭.৫৬ মিলিয়ন টন (৬.৭৩ শতাংশ) গ্রিনহাউজ গ্যাস কমানোর কথা, যার মধ্যে জ্বালানি খাতের অবদান ৯৫.৪ শতাংশ। অন্যদিকে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া সাপেক্ষে আরও ৬১.৯ মিলিয়ন টন গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানোর কথা। সরকারের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অন্যতম উপায়ও হচ্ছে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর।
কারণ সবুজ অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হলো কার্বন নিঃসরণ কমানো, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা। আর এই অর্থনীতিতে এগিয়ে আসছে বিশ্বে বড় বড় আর্থিক সংস্থাগুলো।
১৯৯১ সালে, নেদারল্যান্ডসের ট্রায়োডস ব্যাংক প্রথমবারের মতো পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ শুরু করে। এরপর ২০০৭ সালে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) প্রথম ‘সবুজ বন্ড’ ইস্যু করে, যা নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য তৈরি হয়। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংক প্রথমবারের মতো সবুজ বন্ড ইস্যু করে, যা গ্রিন ফাইন্যান্সের বিশ্বব্যাপী প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সবুজ বিনিয়োগের গুরুত্ব বাড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব।
ফলে বাংলাদেশের জন্য সবুজ অর্থনীতি কেবল একটি বিকল্প নয়। এটি একটি জাতীয় প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্যই নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্যও সবুজ অর্থনীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য।
