বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব, গণশুনানিতে বিরোধিতা গ্রাহকদের

বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব, গণশুনানিতে বিরোধিতা গ্রাহকদের

ফন্ট সাইজ:

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। শতাংশের হিসাবে বর্তমান মূল্যের চেয়ে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ১৭ থেকে ২১ শতাংশ। বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা লোকসান ও ভর্তুকির লাগাম টানতে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব। তবে গণশুনানিতে অংশগ্রহণ করে অংশীজনরা দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

গতকাল রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত গণশুনানিতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় পিডিবি। পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর বুধবার ও বৃহস্পতিবার গণশুনানির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। পিডিবি’র এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবসহ অংশীজনরা। গণশুনানিতে অংশ নেয়া বক্তারা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। একইসঙ্গে শিল্প ও উৎপাদন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

শুনানিতে চলতি অর্থবছরে ৬২ হাজার কোটি টাকা ও আগামী অর্থবছরে ৬৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ঘাটতির কথা তুলে ধরে পিডিবি’র প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, দাম না বাড়ালে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বিদ্যুৎখাত।

গণশুনানিতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প-কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়বে। ভয়াবহ অবস্থা হবে। তাই দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্তই নেয়া যাবে না। তিনি বলেন, পিডিবি দাম বাড়ানোর যে সুপারিশ করেছে, তার সঙ্গে জনগণের স্বার্থ দেখা হয়নি। তাই এই গণশুনানি বাতিল করা হোক।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, এই মুহূর্তে মূল্যহার পরিবর্তন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো অবস্থা হবে। সুতরাং আমি বলবো বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এই চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তনে বিইআরসি কর্তৃক গণশুনানিতে অংশ নিয়ে সংগঠনের পক্ষে তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা যে কম্পিটিটিভনেসটা হারাচ্ছি, যদি এই মূল্য আবার বৃদ্ধি করা হয় তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা যারা শিল্পখাতে আছি, আমরা প্রতিযোগিতা হারাবো। তিনি বলেন, আমাদের বর্তমানে এক্সপোর্টের যে নিম্নগতি, বিগত কয়েক মাস যাবৎই আমাদের এক্সপোর্ট কমে যাচ্ছে। একসময় আমরা এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলাম। এটা কিন্তু আস্তে আস্তে নিচের দিকে যাচ্ছে। চায়নার পরে বাংলাদেশ ছিল, এটা কিন্তু আমরা হারিয়ে ফেলবো। আমি বলবো যে, কোনো অবস্থাতেই মূল্যহার বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের গড় দাম ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৬৫ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে, যার ফলে সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের উচ্চমূল্য এবং ক্যাপাসিটি চার্জের সংকটকে এই মূল্য সমন্বয়ের মূল কারণ হিসেবে দেখিয়েছে সংস্থাগুলো। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ বিপিডিবি’র ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। আগামী অর্থবছরে এই ঘাটতির পরিমাণ আরও তিন গুণ বেড়ে ৩২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি কমিয়ে আনতেই মূলত খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৬৫ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। শুধু আবাসিক গ্রাহকই নন, এই মূল্যবৃদ্ধির আঁচ লাগবে দেশের উৎপাদনশীল ও সেবা খাতেও। আবাসিক খাতের পাশাপাশি সেচ পাম্প, নির্মাণ খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্প-কারখানা এবং ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনগুলোর বিদ্যুতের দামও ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে

খুচরা পর্যায়ের পাশাপাশি বিদ্যুতের পাইকারি দামও বাড়ানোর বড় প্রস্তাব দিয়েছে বিপিডিবি। সংস্থাটির মতে, বর্তমানে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম। এই অসামঞ্জস্যতার কারণে প্রতি বছর বিপিডিবি’র লোকসান ও সরকারের ভর্তুকির বোঝা বেড়েই চলেছে। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, পাইকারি মূল্য বাড়ানো না হলে আগামী অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ালে ১৬ হাজার ৬২২ কোটি ৭০ লাখ টাকার রাজস্ব ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে।

দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও (আরইবি) তাদের লোকসান সামাল দিতে নতুন মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দিয়েছে। বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৭৯ লাখ ৯৮ হাজার ১২৬ জন গ্রাহক পল্লী বিদ্যুতের আওতাভুক্ত, যার মধ্যে প্রায় ৬১ শতাংশই গ্রামীণ ও প্রান্তিক আবাসিক গ্রাহক। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। তবে আগামী অর্থবছরে এই লোকসানের বোঝা আরও বেড়ে ২ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই বিশাল ঘাটতি কাটিয়ে উঠতেই মূলত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এদিকে, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আলোচনা চলমান থাকার মধ্যেই এবার সঞ্চালন চার্জ বা হুইলিং চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। সংস্থাটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জ বর্তমান ৩০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৯ পয়সা করার আবেদন জানিয়েছে।

গণশুনানিতে এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিটে ১৯ পয়সা বা প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সঞ্চালন চার্জ বাড়তে পারে। পিজিসিবি’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গ্রিড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

বিশ্লেষকদের শঙ্কা, এই প্রস্তাব অনুমোদন পেলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম আরও একদফা বাড়তে পারে। বিইআরসি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদনের ওপর পৃথক গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। গণশুনানিতে বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।



ট্যাগসমূহ:

লিমা

২ মাস আগে

হাসিনার রাস্তায় তারেক জিয়া? এই মুহুর্তে কি প্রয়োজন? দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ রা চলতে পারছে না।

মাহবুব হোসেন

২ মাস আগে

খুব প্রয়োজন পরলে সরকারি চাকুরীজিবীদের বেতন বাড়ানোর টাকা দিয়ে লোকসান মিটানো জোক।

মন্তব্য করুন