একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র তার বাহ্যিক অবকাঠামো বা জিডিপি’র প্রবৃদ্ধিতে প্রকাশ পায় না; বরং প্রকাশ পায় সে তার বিচার বিভাগের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। আদালত কেবল বিরোধ নিষ্পত্তির যান্ত্রিক টেবিল নয়;
এটি রাষ্ট্রক্ষমতার অন্ধ দাপটের বিরুদ্ধে অসহায় নাগরিকের শেষ নৈতিক ও আইনি দুর্গ। যে রাষ্ট্র নিজের বিচার বিভাগকে প্রশাসনিকভাবে স্বাবলম্বী দেখতে অস্বস্তিবোধ করে, সে মূলত নিজের ক্ষমতার কোনো সীমারেখা বা জবাবদিহিতাকেই স্বীকার করতে চায় না।
এই আলোকেই বলা যায়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের একটি অদূরদর্শী, বিপজ্জনক এবং আত্মঘাতী পশ্চাদপসরণ। বহু দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আন্দোলন এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের দীর্ঘ ইতিহাসের পর যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি গড়ে উঠেছিল, তাকে এক কলমের খোঁচায় বিলুপ্ত করা মানে কেবল একটি সচিবালয় বাতিল করা নয়, এটি রাষ্ট্রের নিজস্ব সাংবিধানিক বিবর্তনকে অস্বীকার করা, ইতিহাসকে উল্টো দিকে ঠেলে দেয়া।
সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা: বাংলাদেশের সংবিধান ক্ষমতার বিভাজনের নীতিকে ‘ ঝবঢ়ধৎধঃরড়হ ড়ভ চড়বিৎং্থ রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে ধারণ করে। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার যে নির্দেশনা রয়েছে, তা কোনো অলংকার নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর আরোপিত নৈতিক সীমারেখা। অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।” কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে প্রকারান্তরে বিচার বিভাগকে আবার নির্বাহী বিভাগের প্রশাসনিক ছায়াতলে ফিরিয়ে নেয়া হলো, যা প্রজাতন্ত্রের অপরিহার্য শর্তকে লঙ্ঘন করে।
১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশের সাংবিধানিক অভিযাত্রা ছিল বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার সংগ্রাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন বিচার বিভাগ রায়ে স্বাধীন হলেও প্রশাসনিকভাবে ছিল নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের ভেতরেই। এই দ্বৈততা ছিল সাংবিধানিক আদর্শ ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যে এক স্থায়ী বিরোধ। সেই অচলায়তন ভেঙে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ছিল একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। এটি নিখুঁত ছিল না, কিন্তু এর পেছনে একটি মৌলিক রাষ্ট্রনৈতিক স্বীকৃতি ছিল বিচার বিভাগ কেবল রায় প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নিজের প্রশাসনিক অস্তিত্ব পরিচালনায় স্বশাসিত একটি সাংবিধানিক অঙ্গ।
প্রজাতন্ত্রের নৈতিক দ্বিচারিতা: এখানেই সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি জাগে, যে রাষ্ট্রে জাতীয় সংসদের জন্য আলাদা সচিবালয় থাকতে পারে, নির্বাচন কমিশন বা অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো থাকতে পারে সেই রাষ্ট্রে প্রজাতন্ত্রের অভিভাবক, সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকার সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব সচিবালয় থাকবে না কেন? কোন সাংবিধানিক যুক্তিতে এই বিলুপ্তি? কোন রাজনৈতিক দর্শনে এই
সংকোচন? কোন প্রজাতান্ত্রিক নৈতিকতায় এই বৈষম্য?
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আইনি নয়; এর উত্তর লুকিয়ে আছে ক্ষমতার মনস্তত্ত্বে। সচিবালয় মানে কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক আত্মনিয়ন্ত্রণ। যার নিজের ঘর গোছানোর স্বাধীনতা নেই, তার বিচারিক স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত কাগুজে প্রতীকে পরিণত হতে বাধ্য।
ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও দার্শনিক সংকট: এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নয়, গভীরভাবে দার্শনিক। মঁতেস্কু যখন ক্ষমতার বিভাজনকে নাগরিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত বলেছিলেন, তখন তিনি জানতেন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন অনিবার্যভাবে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত করে। কোনো সাংবিধানিক অঙ্গ যদি তার দৈনন্দিন প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের জন্য অন্য অঙ্গের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে সেখানে “ভারসাম্য” কেবল সংবিধানে টিকে থাকে, বাস্তবে তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
হান্না আরেন্ড যেভাবে সড়ফবৎহ রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের ক্ষয়কে কর্তৃত্ববাদের পূর্বলক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, এই বিলুপ্তির মধ্যেও সেই বিপজ্জনক প্রবণতার ছায়া স্পষ্ট। বিচার বিভাগকে সমকক্ষ সাংবিধানিক শক্তি হিসেবে না দেখে একটি প্রশাসনিক শাখা বা পরিদপ্তরে নামিয়ে আনার ঝুঁকি এখানে উপেক্ষা করা যায় না।
জবাবদিহিতা ও আমাদের করণীয়: এখানে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার প্রশ্নটি এড়ানো যায় না। যে অধ্যাদেশকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তর করা হলো না, সেই কাঠামো কেন এবং কোন সাংবিধানিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিলুপ্ত হলো তার একটি সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য ব্যাখ্যা রাষ্ট্রের দেয়া উচিত ছিল। যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের বিপুল সময়, অর্থ ও প্রশাসনিক সম্পদ ব্যয় হয়েছে, সেটিকে হঠাৎ করে বিলুপ্ত করার যৌক্তিকতা জনগণের সামনে পরিষ্কার না করলে তা কেবল নীতিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকটও তৈরি করে।
একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা মাপা হয় না তার ফ্লাইওভার বা উন্নয়ন প্রকল্পে; বরং মাপা হয় সে নিজের ক্ষমতাকে কতোটা সীমিত করতে পারে তার সক্ষমতায়। প্রজাতন্ত্রের মহত্ত্ব ক্ষমতার বিস্তারে নয়, ক্ষমতার আত্মসংযমে। যে রাষ্ট্র বিচার বিভাগের স্বাধীন প্রশাসনিক অস্তিত্বকেও সহ্য করতে পারে না, সে রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক পরিপক্বতার ভেতরেই একটি গভীর দুর্বলতা প্রকাশ করে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক স্থাপত্যের ওপর একটি গভীর আঘাত। এই পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজ, আইন অঙ্গন এবং সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বিচার বিভাগের পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হতে হবে। প্রয়োজনে এই সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতাকে আইনি প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জ করা জরুরি। তা না হলে, রাষ্ট্রের এই আত্মঘাতী পশ্চাদপসরণ আমাদের এক অন্ধকার, অনিশ্চিত এবং জবাবদিহিহীন ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে।
লেখক: গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক
faraiæ[email protected]

Hedayet Ullah
২ মাস আগেআবার ৫ই অগাস্ট / ৩৬ই জুলাই অনিবার্য। এর বিকল্প দূর্নিতিবাজ রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টের জন্য বাংলাদেশে আপাতত দেখা যাচ্ছে না।