বাস-ট্রেনের টিকিট পেতে যুদ্ধ

বাস-ট্রেনের টিকিট পেতে যুদ্ধ

ফন্ট সাইজ:

ঈদ এলেই রাজধানী ছাড়ার হিড়িক পড়ে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে নাড়ির টানে ছুটেন গ্রামের বাড়ি। এতে চাপ পড়ে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে। কিন্তু রাজধানী ছেড়ে যাওয়া দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের ধারণক্ষমতার চেয়ে গণপরিবহনে আসন অনেক কম। ফলে বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চের টিকিট কাটতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয় যাত্রীদের। সবচেয়ে বেশি মানুষ যাতায়াত করেন সড়কপথে। রেলপথে সীমিত আসন হলেও যাত্রীদের বড় অংশের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে ট্রেন। ফলে রেলপথের আগাম টিকিট কাটতে রীতিমতো শুরু হয় যুদ্ধ। টিকিট পাওয়া যেন সোনার হরিণ!

ঈদুল আজহায় ট্রেনে ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ হয়েছে গতকাল। আজ শুরু হচ্ছে ফিরতি যাত্রার টিকিট বিক্রি। বরাবরের মতো এবারো আন্তঃনগর ট্রেনের সাতদিনের অগ্রিম টিকিট বিশেষ ব্যবস্থায় বিক্রি করা হচ্ছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রি করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে অনলাইনে টিকিট কিনতে রীতিমতো হুমড়ি খেয়ে পড়েন যাত্রীরা। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় টিকিট। অল্প সময়ের মধ্যেই লাখ লাখ হিট পড়ে রেলের ওয়েবসাইটে। সকাল ৮টা থেকে অনলাইনে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের এবং দুপুর ২টা থেকে বিক্রি করা হয় পূর্বাঞ্চলের আন্তঃনগর ট্রেনের অগ্রিম টিকিট। কিন্তু অনেক যাত্রীই নির্দিষ্ট সময় শুরু হওয়ার আগে থেকেই প্রস্তুত থাকেন টিকিট কাটার জন্য। কারণ মিনিটের মধ্যেই বুকিং হয়ে যেতে পারে কাঙ্ক্ষিত সময়ের কাঙ্ক্ষিত ট্রেনটি। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৪শে মে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোর মোট আসন সংখ্যা ৩২ হাজার ২১৯টি। এরমধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি ট্রেনের মোট আসন ১৬ হাজার ২৪৫টি এবং পূর্বাঞ্চলের ২৩টি ট্রেনের মোট আসন ১৫ হাজার ৯৭৪টি। আর সারা দেশের ট্রেনগুলোর মোট আসন সংখ্যা এক লাখ ৬৯ হাজার ৭৫৭টি।

২৩শে মে’র পশ্চিমাঞ্চল রুটে চলাচল করা আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কিনতে অনলাইনে বিক্রি শুরুর প্রথম ৩০ মিনিটে টিকিটের জন্য ওয়েবসাইট-অ্যাপে ৬০ লাখ বার হিট করেছে টিকিট প্রত্যাশীরা। ২৪শে মে ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিনের টিকিট কাটতে পশ্চিমাঞ্চলগামী আন্তঃনগর ট্রেনের আসনের জন্য টিকিট বিক্রির প্রথম ৩০ মিনিটেই ওয়েবসাইট ও অ্যাপে ৯৪ লাখ হিট; চতুর্থ দিনের, অর্থাৎ ২৬শে মে’র পশ্চিমাঞ্চলগামী ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরু হলে বিক্রির প্রথম ৩০ মিনিটেই ওয়েবসাইট ও অ্যাপে এক কোটি ২৭ লাখ হিট করেন টিকিটপ্রত্যাশীরা।

সাংবাদিক সাইমুন চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য চট্টলা ট্রেনকে বেছে নেন। এবার ২৬শে মে বাড়ি যাবেন। তিনি বলেন, প্রতিবার ট্রেনের টিকিট কাটতে যুদ্ধ করতে হয়। প্রতিবার ঈদে বাড়ি যেতে টিকিটের জন্য মুখিয়ে থাকি। সবসময় পাই না। এবার অবশ্য পেয়েছি। নির্দিষ্ট সময়ের অন্তত আধাঘণ্টা আগ থেকেই টানা রেলসেবা অ্যাপে ঢুকে বসে ছিলাম। সময় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেটে ফেলছি। আসন ঠিক করে পেমেন্ট করার আগ পর্যন্ত টানা উত্তেজনা কাজ করেছে। এই বুঝি শেষ হয়ে গেল। বেনাপোল এক্সপ্রেসের যাত্রী হাসান একজন ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, আমার নিজস্ব ব্যবসায় থাকায় সবকিছু গুছগাছ করে ট্রেনের নির্দিষ্ট সময়ে টিকিট পাওয়া একদমই দুষ্কর। গত ১৫ বছর ধরে যশোরে যাই। ট্রেনেই যাই। কিন্তু সারা বছর কোনো ঝামেলা হয় না। ঈদের সময় কোনোভাবেই টিকিট মেলাতে পারি না। বাধ্য হয়ে বাসে যাতায়াত করতে হয়।
ওদিকে, গত ৮ই মে থেকে দূরপাল্লার বাসের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই আগাম টিকিট বিক্রি প্রায় শেষের দিকে। ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শুরু হবে আগামী ২৫শে মে থেকে। তবে ছুটি শুরুর আগেই বাসের টিকিট সংকট দেখা দিয়েছে। ২৮শে মে ঈদ হবে বিধায় তার আগের ২৫ ও ২৬শে মের টিকিট নেই বললেই চলে। ২৪ মে’র ও ২৭শে মে’র স্বল্পসংখ্যক টিকিট মিলছে। কাউন্টারগুলোতে দেখা গেছে, ২৪শে মে’র বাসগুলোতে চাইলেই ইচ্ছামতো সময়ে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। ২৫ ও ২৬শে মে’র টিকিটের জন্য কোনো যাত্রী এলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে টিকিট নেই বলে। সরজমিন ঢাকার বড় বাস টার্মিনাল সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।

সরজমিন বাস টার্মিনালগুলো ঘুরে আরও দেখা গেছে, এখনো ঈদের চাপ পড়েনি টার্মিনালগুলোতে। বেশির ভাগ কাউন্টারেই দুই থেকে চারজন করে যাত্রী দেখা গেছে। অনেক পরিবহনেই ডেকে ডেকে যাত্রী তুলছিলেন বাসে। তবে আগাম টিকিটের জন্য এলে অনেক যাত্রীই টিকিট না পেয়ে ফেরত যাচ্ছিলেন। টিকিটপ্রত্যাশীর যাত্রীরা বলেন, তাদের অনেকেই অনলাইনে টিকিট কাটার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু অনলাইনে টিকিট না পেয়ে বিভিন্ন বাস কাউন্টার ঘুরে টিকিট নেয়ার চেষ্টা করছেন। বাস কাউন্টার সংশ্লিষ্টরা জানান, বেশির ভাগ টিকিটই আগাম বিক্রি হয়ে গেছে। কাউন্টার ফাঁকা থাকার কারণ, যাত্রীরা আগাম টিকিট কেটে নেয়ায় নির্দিষ্ট যাত্রা সময়ে কাউন্টারে এসে উপস্থিত হন। কাউন্টার থেকে জানানো হয়, ঈদ উপলক্ষে বাস টার্মিনালে ভিড় শুরু হয়নি এখনো। ফলে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে ভোগান্তিহীন ভ্রমণ করতে পারছেন।
ফেনীর স্টারলাইন পরিবহনের যাত্রী আমান উল্লাহ আলভী বলেন, নদ্দা থেকে টিকিট কাটতে গিয়েছিলাম ২৪ তারিখের জন্য। গিয়েই শুনি টিকিট নেই। গত ঈদুল ফিতরে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে টিকিট কিনতে পেরেছি। এই ঈদে শুরুতেই নদ্দা কাউন্টার থেকে টিকিট কাটতে গিয়ে হোঁচট খাই। পরে মানিকনগর থেকে টিকিট কেটে নিই। তাও কাঙ্ক্ষিত সময়ে টিকিট পাইনি। ঈদের ছুটিতে নিজ গ্রামের বাড়ি রংপুর যাবেন আব্দুল হাই। মহাখালী বাস টার্মিনালে ঘুরছিলেন টিকিটের জন্য। কথা হলে তিনি বলেন, গতকাল গাবতলীর বাস কাউন্টারগুলোতে ঘুরেছি টিকিটের জন্য, পাইনি।

আজ মহাখালী এসে ঘুরছি। কিন্তু এখনো কাটা যায়নি। অনলাইনে খোঁজ নিয়েছি, সব বুক হয়ে গেছে। ট্রেনের টিকিটও পাইনি। টিকিট কাটতে রীতিমতো হয়রান।
লালমনিরহাটের বুড়িমারীগামী ফাহমিতা এক্সপ্রেসের টিকিট বিক্রেতা অমিত বলেন, অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ। কিন্তু এরপরও অনেকেই এসে ফেরত যাচ্ছেন। ঢাকার মধ্যেই অনেকগুলো কাউন্টার থাকায় বেশি দেরি হয় না টিকিট বিক্রি হতে। তার ওপর ঈদের চাপ তো আছেই। সায়েদাবাদ শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের কাউন্টার থেকে জানানো হয়, বেশির ভাগ টিকিটই অনলাইনে আগে থেকেই বিক্রি করা হয়েছে। যারা অনলাইনে টিকিট কেটেছেন বেশির ভাগই ২৪ ও ২৫শে মে’র যাত্রী। তবে এখন কিছুটা ফাঁকা থাকলেও সময় যত এগোবে, যাত্রীচাপ ধীরে ধীরে বাড়বে। মহাখালীর বাস টার্মিনালের ইউনাইটেড বাসের টিকিট বিক্রেতা রাজীব বলেন, এখন সাধারণত আমাদের যে রেগুলার যাত্রী তারা যাতায়াত করছে। আসল ঈদযাত্রার চাপ পড়বে রোববার দুপুরের পর থেকে। জলসিঁড়ি বাসের টিকিট বিক্রেতা মোহাম্মদ মোজাম্মেল বলেন, এখনো ঈদের যাত্রী তো হচ্ছেই না বরং কম হচ্ছে সকলেই আশায় বসে আছে যে একসঙ্গে ঈদের সময় তাই কিছুটা কম ২৫ তারিখের পরে এ সংখ্যা বাড়বে।

মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বাবুল মানবজমিনকে বলেন, প্রতিবারের মতো এবারো টার্মিনাল থেকে যাত্রীরা যাতে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে সেজন্য আমরা তদারকি করছি। কোনো বাস অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে বাস চালাতে দেবো না। তাছাড়া ভলান্টিয়ার, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও টার্মিনালে নিয়োজিত আছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন