‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে’- মাহফুজ আলমের পোস্ট ঘিরে আলোচনা-

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ কার্যত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ব্যাক করেছে’ (ফিরে এসেছে)-এক ফেসবুক পোস্টে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের এমন বক্তব্য ঘিরে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। মাহফুজ আলমের এই পোস্টকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের কারও কারও বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ সামনে তুলে আনছেন। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, মাহফুজ আলম এখন যে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করছেন, সেই সরকার থেকে তাহলে তখন তিনি কেন সরে দাঁড়াননি। গতকাল ফেসবুকে আরেকটি পোস্ট দিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক এই উপদেষ্টা।

অবশ্য মাহফুজ আলম এমন এক সময়ে আওয়ামী লীগের ফেরা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলেন, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘প্রত্যাবর্তন ২.০’এর বিষয়টি আলোচনায় এনেছেন আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগী-অঙ্গ সংগঠনের নেতা–কর্মীরা। এ ছাড়া ভারতের কিছু গণমাধ্যম সম্প্রতি শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার রাতে মাহফুজ আলম ফেসবুকে আওয়ামী লীগসংক্রান্ত পোস্টটি দেয়ার পর সাবেক এই উপদেষ্টার এমন অবস্থানের বিষয়ে জানা-বোঝার চেষ্টা করছেন তার এক সময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। মাহফুজ আলমের নেতৃত্বে গত মার্চে আত্মপ্রকাশ করে ‘অলটারনেটিভস’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম।

গত মঙ্গলবার রাতে ফেসবুকে আওয়ামী লীগ-সম্পর্কিত ওই পোস্টে মাহফুজ আলম লেখেন, ‘লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে। কীভাবে ফিরলো, সে গল্পই বলবো আজ।’ এরপর আওয়ামী লীগ কীভাবে ফিরেছে, তার বড় একটি তালিকা তুলে ধরেন তিনি। পোস্টটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৭ হাজারের বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এ ছাড়া পোস্টে মাহফুজের দেয়া যুক্তি নিয়ে অনেকেই ফেসবুকে লিখেছেন।

মাহফুজের ওই পোস্টের নিচে বেশ কয়েকজন মন্তব্যও করেছেন। শাহবাগ থানার সামনে মাইকে ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই মাস জেলে থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া শামসুন নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ (ইমি) মন্তব্যের ঘরে লিখেছেন, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করসে, যেদিন ৩২ ভাঙতে গেসিলা। লীগ সেদিনই ব্যাক করসে যেদিন এনসিপি’র কারণে গোপালগঞ্জে ৫ খুন হয়। এই দুইটা পয়েন্ট বাদ পড়সে।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আবু বাকের মজুমদার লেখেন, ‘উপদেষ্টাদের কারও কারও অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়টা মিস (উল্লেখ করা হয়নি) গেছে ভাই। ওইটা যদি একটু অ্যাড (যোগ করা) করতেন।’

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ মাহফুজের পোস্টে মন্তব্যে লেখেন, ‘যে ইন্টেরিমের সমালোচনা এখন করছেন, তখন যখন আপনি নিজেও এই সরকারের অংশ ছিলেন, আপনি পদত্যাগ করেন নাই কেনÑ এইটার জবাবও কিন্তু পাওনা। যখন দেখলেন ইন্টেরিম উগ্র ডানপন্থিদের পেট্রন (পৃষ্ঠপোষকতা) করছে, তখন তো আটকাতে না পারার ব্যর্থতা নিয়েই সততার সঙ্গে ইন্টেরিম থেকে সরে যেতে পারতেন। সেটা না করে আপনি আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাইছেন।’

এসব মন্তব্যের জবাবে মাহফুজ আলম কিছু বলেননি। তবে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য নূমান আহমাদ চৌধুরীর এক মন্তব্যের উত্তর দিয়েছেন তিনি। নূমান লিখেছিলেন, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ভেইগ একটা বিষয়কে মুজিববাদ বলে শেষে মুর্দাবাদ শব্দ জুড়ে দেয়া হয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল যেদিন ক্ষমতার বিপরীতে সত্য বলা মানুষগুলোকে মুজিববাদী বাম ট্যাগিং করে নিধনযোগ্য করার বন্দোবস্ত চালু করা হয়েছিল।’ এই মন্তব্যের জবাবে মাহফুজ বলেছেন, ‘নারে ভাই, মুজিববাদ বাস্তব, ভেইগ কিছু না। আর মুজিববাদী বাম মানে বাকশালী বাম, সেটাও রিয়ালিটিই। লীগ ব্যাক করলে মুজিববাদী বাম আর কট্টর ডানের মিতালিতেই ব্যাক করবে।’

মাহফুজের এই পোস্টের পর আওয়ামী লীগের ফেরা প্রসঙ্গে আরও অনেকেই ফেসবুকে লিখেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক আসিফ নজরুল লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি, তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।’
সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ এক দীর্ঘ পোস্টে লেখেন, ‘লীগ ফেরত আসবে না। কিন্তু যে কারণে লীগকে মানুষ মরিয়া হয়ে হঠাতে চেয়েছে, সেই পুরনো বন্দোবস্ত ফেরত এসেছে। যাদের উপলক্ষ করে মানুষ জুলাইয়ে মাঠ দখল করেছিল, তাদের দাবার ঘুঁটি বানিয়েই পুরনো বন্দোবস্ত ফেরত এসেছে।’

মাহফুজ আলমের ব্যাখ্যা: আওয়ামী লীগের ফেরা নিয়ে দেয়া ফেসবুক পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার পর আরেক পোস্টে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন মাহফুজ আলম। দ্বিতীয় পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘যারা আগের পোস্টকে পর্যালোচনা হিসেবে পাঠ করেছেন, তাদের জন্য বলছি। আমাদের এখনকার কাজ হলোÑ সব নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে থাকা। দল-মত-ধর্মনির্বিশেষে বাংলাদেশের সব নাগরিকের মানবাধিকারের পক্ষে থাকা। হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা।’
মাহফুজ আলম সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থিদের ওপর হামলার বিচার করার দাবি অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন। তিনি জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিকে প্রধান করে তোলা এবং একইসঙ্গে বিচারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে থাকার কথাও বলেছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করার পক্ষে মাহফুজ আলম। তিনি বলেছেন, ‘বাংলার বহু ভাষা-সংস্কৃতিকে যাপন-উদ্যাপন করা এবং রিগ্রেসিভ-ডিফিটিস্ট কালচারাল লড়াইকে (পশ্চাৎপদ-পরাজিত সাংস্কৃতিক লড়াই) জায়গা না দেয়া। কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা বিভিন্ন বর্গ থেকে জুলাইয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাদেরকে ওন (ধারণ) করা। লীগের ফ্যাসিস্টদের লক্ষ্যবস্তু এরাই।’
এ প্রসঙ্গে এই পোস্টে মাহফুজ আলম আরও লেখেন, ‘যে যার জায়গা থেকে সক্ষম, যত বেশি সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তোলা। জুলাইয়ের পক্ষের সব শক্তির মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের একটা কমন স্পেস বা ল্যাঙ্গুয়েজ (অভিন্ন জায়গা বা ভাষা) তৈরি করা। অন্তর্ঘাতের ইতিহাস মাথায় রাখা। লীগের ধর্মতত্ত্ব ও বয়ানকে নর্মালাইজ করার বিরুদ্ধে জুলাই ও গত ১৬ বছরের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের বয়ানকে কেন্দ্রীয় করে তোলা। গত দেড় বছরকে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের চাইতে দুঃসহ বা খারাপ করে দেখাতে চেষ্টা করার মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনার অপকর্ম যারা ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, সেসব লীগের ফ্যাসিস্টদের প্রতিহত করা।’

মাহফুজ আলম অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশের কৃষক-শ্রমিক, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জীবন-জীবিকার সংকট দূর করতে সরকারকে বাধ্য করার কথা বলেছেন। সেইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং সমন্বয়হীনতা এড়াতে দোষারোপের রাজনীতি বাদ দিয়ে সব নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা চালুর পক্ষে লড়াই অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ। জুলাইকে একটি মতাদর্শের ব্যানারে কুক্ষিগত ও বিভাজিত করার সব প্রকল্পকে পরাস্ত করা দরকার বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন