অধ্যাপক কে এ এম সা’দ উদ্দিন (১৯৩৫-২০২৬)

শ্রদ্ধাঞ্জলি

অধ্যাপক কে এ এম সা’দ উদ্দিন (১৯৩৫-২০২৬)

ফন্ট সাইজ:

যে কোনো মৃত্যুই বেদনাদায়ক, আর যখন তা একজন গুণী শিক্ষক ও প্রজন্ম গড়ার কারিগরের, তখন সেই শূন্যতা আরও গভীর হয়ে ওঠে। অধ্যাপক কে এ এম সা’দ উদ্দিন ছিলেন বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের এক প্রথিতযশা শিক্ষক, যিনি দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে জ্ঞান ও আদর্শের আলোয় গড়ে তুলেছেন।

মাত্র এক মাস আগে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে তাঁর বাসায় যাওয়া হয়েছিল। সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ১৫ তারিখ সকালে তাঁর সহধর্মিণীর ফোন-“তোমার স্যার নেই”- এই সংবাদে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় মন। ৯০ বছর বয়সে তিনি চিরবিদায় নিলেন। সমাজবিজ্ঞান চর্চার পরিমণ্ডলে এটি এক অপূরণীয় ক্ষতি। অধ্যাপক সা’দ উদ্দিনের জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯৩৫ সালে, বৃহত্তর ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ জেলায়। বরিশালে তাঁর বেড়ে ওঠা। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি বরিশাল জেলা স্কুল থেকে ১৯৫১ সালে মেট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আই.এ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বি.এ (সম্মান) ও এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন যথাক্রমে ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে।

ছাত্রজীবনে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি অধ্যায় সমাপ্ত হয়। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় তিনি সমগ্র পাকিস্তানে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। তবে রাজনৈতিক কারণে তিনি সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে পারেননি। পরবর্তীতে শিক্ষকতাকেই তিনি জীবনের প্রধান পথ হিসেবে গ্রহণ করেন।

১৯৫৯-৬০ সালে নাটোর কলেজে শিক্ষকতা শুরু করে পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৪-১৯৬৯ সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষকতায় যুক্ত থেকে ১৯৬৬ সালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে দেশে ফিরে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন এবং ২০০২ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এ কারণে তাঁকে আটক ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরবর্তীতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও ফেডারেশনের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়। অধ্যাপক সা’দ উদ্দিন ছিলেন কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ, গভীর দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন এবং একই সঙ্গে মানবিক গুণসম্পন্ন একজন শিক্ষক। তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষেই নয়, সামাজিক ও জাতীয় ইস্যুতেও সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। গবেষণা ও লেখালেখিতে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য হলেও তার একটি বড় অংশই অপ্রকাশিত থেকে গেছে। অবসর গ্রহণের পরও তিনি ন্যায়, মানবাধিকার ও বৈশ্বিক ইস্যুতে তাঁর অবস্থান অব্যাহত রাখেন। তাঁর জীবন ছিল আদর্শ, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ। অধ্যাপক কে এ এম সা’দ উদ্দিনের প্রয়াণে আমরা একজন শিক্ষক, সংগঠক ও বিবেকবান মানুষের উপস্থিতি হারালাম। তাঁর স্মৃতি, চিন্তা ও আদর্শ আমাদের পথচলায় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক পরিচিতি
ড. নেহাল করিম
প্রাক্তন চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন