শুভেচ্ছার বার্তা, নাকি উদীয়মান আঞ্চলিক জোটকে ভণ্ডুল করার কৌশলী প্রয়াস?

শুভেচ্ছার বার্তা, নাকি উদীয়মান আঞ্চলিক জোটকে ভণ্ডুল করার কৌশলী প্রয়াস?

ফন্ট সাইজ:

আমি একে হৃদয়ের পরিবর্তন বলব না; বরং বলব, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং বৃহত্তর বৈশ্বিক ভূরাজনীতির দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাধ্য হয়ে ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের এক নতুন কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ।

বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের দীর্ঘদিনের “আঞ্চলিক পরাশক্তি” হওয়ার স্বপ্ন নানা দিক থেকে চাপে পড়েছে। পাকিস্তান সামরিক ও কৌশলগতভাবে পুনরায় গুরুত্ব অর্জন করছে; চীন দক্ষিণ এশিয়ায় তার অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব আরও সুদৃঢ় করেছে; তুরস্ক মুসলিম বিশ্বে এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা বাড়াচ্ছে; অন্যদিকে বাংলাদেশও ধীরে ধীরে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় ভারতের নীতিনির্ধারক মহলে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।

বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা, ইরানকে ঘিরে মার্কিন-ইসরায়েলি চাপ, এবং বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকেও নতুন করে কৌশল নির্ধারণে বাধ্য করছে। ভারত দীর্ঘদিন “স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি”র কথা বললেও বাস্তবে পশ্চিমা বলয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। এর বিপরীতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন এবং সম্ভাব্যভাবে তুরস্কের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রির সাম্প্রতিক বক্তব্য ও তৎপরতাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই।

বীণা সিক্রির অতীত রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তথাকথিত ইসলামি জঙ্গিবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে বহু সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীল বিষয়েও প্রকাশ্য মন্তব্য লক্ষ্য করা গেছে।

বাংলাদেশের জনগণের দৃষ্টিতে ভারত সম্পর্কে যেসব দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
• সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ড
• এনআরসি ও নাগরিকত্ব প্রশ্নে উদ্বেগ
• তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন সমস্যা
• বাণিজ্য বৈষম্য
• বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
• আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী মনোভাব
এই প্রশ্নগুলো এখনও অনিরসিত। ফলে ভারতের পক্ষ থেকে হঠাৎ সৌহার্দ্যের ভাষণ এলে তা স্বাভাবিকভাবেই সংশয়ের জন্ম দেয়।

বীণা সিক্রি অতীতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদবিরোধী অবস্থানের প্রশংসা করলেও, একই সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগকে বাংলাদেশের উপর ধারাবাহিকভাবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়েও তিনি সার্ক প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে “সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে” দায়ী করে ভারতের অবস্থানকে ন্যায়সঙ্গত বলে তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক (MoU), যা মাদক পাচার, অর্থপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের লক্ষ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলে, তা ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকেও অগ্রসর হতে পারে। এ সম্ভাবনাই সম্ভবত নয়াদিল্লির কৌশলগত মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত দীর্ঘদিন ধরে “বিগ ব্রাদার” ভূমিকা পালন করেছে। সার্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়ার পেছনেও ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত। অথচ বর্তমানে আবার সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রশ্ন সামনে আনা হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগে—এটি কি সত্যিই আঞ্চলিক সহযোগিতার আন্তরিক আহ্বান, নাকি নতুন আঞ্চলিক সমীকরণকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা?

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবে “প্রভাববলয়” রক্ষার কৌশলের উপর দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা, পাকিস্তানের পুনরুত্থান, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে বাংলাদেশ যদি বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির পথে এগোয়, তবে ভারত তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে—এটাই স্বাভাবিক।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন কোনো ভারতীয় “নিরাপত্তা গ্যারান্টি” সম্পর্কে অবগত নই, যার কথা বিভিন্ন মহলে শোনা যায়। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে স্বাক্ষরিত বিতর্কিত ২৫ বছরের চুক্তি পুনর্নবায়ন হয়েছে কিনা, সে বিষয়েও কোনো স্বচ্ছতা নেই।

বীণা সিক্রি ভারতীয় কূটনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী মহলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ফলে তার বক্তব্যকে নিছক ব্যক্তিগত মতামত বলে উড়িয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত হবে না। বরং এটি দক্ষিণ ব্লকের বৃহত্তর কৌশলগত মনোভাবেরই প্রতিফলন হতে পারে।

তবে এটাও সত্য যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। সার্ক পুনরুজ্জীবিত হলে তা নীতিগতভাবে স্বাগতযোগ্য। কিন্তু বাংলাদেশকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যাতে আঞ্চলিক সহযোগিতার নামে কোনো একক শক্তির কৌশলগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত না হয়।

বাংলাদেশের উচিত হবে—
• আবেগ নয়, বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করা;
• বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা;
• জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া;
• এবং যেকোনো প্রস্তাবকে দক্ষ কূটনীতিক, সামরিক বিশেষজ্ঞ ও কৌশল বিশ্লেষকদের মাধ্যমে সূক্ষ্মভাবে মূল্যায়ন করা।

রাষ্ট্রনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই—স্থায়ী হলো কেবল জাতীয় স্বার্থ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও সেই নীতির উপরই প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন