‘গণরায় উপেক্ষা করলে জনগণ আপনাদেরও প্রত্যাখ্যান করবে’

‘গণরায় উপেক্ষা করলে জনগণ আপনাদেরও প্রত্যাখ্যান করবে’

ফন্ট সাইজ:

জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অতীতে কেউ কোনোদিন রেহাই পায়নি এবং বর্তমান সরকারও পাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল দুপুর ২টায় রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, তীব্র জনদুর্ভোগ লাঘব ও পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে এই বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাজপথ ও সংসদে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেন।

রাজশাহী মহানগরীর সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল এবং রাজশাহী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি গোলাম মর্তুজার যৌথ সঞ্চালনায় বক্তব্যের শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও কোরবানির কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, যাদের ত্যাগের কারণে বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যাদের কারণে সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে, অনেকে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন, কেউ প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতা হতে পেরেছেন, তাদের আত্মা আজ আমাদের দিকে চেয়ে আছে। এই পরিবর্তন যখন হয়, তখন একদল জানবাজ তরুণ-তরুণী সামনে এসে বুক চিতিয়ে ভয়কে জয় 
করে গুলির মুখে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বিরোধী দলগুলো দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর আন্দোলন করলেও ফ্যাসিবাদীরা পালিয়ে যায়নি, কিন্তু যেদিন তরুণ-তরুণীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এলো এবং জনগণ তাদের ডাকে রাস্তায় নামলো, সেদিনই আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেছে।

বর্তমান সরকারি দলের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, এখন সরকারি দলের বন্ধুরা সেই তরুণদের কাউকে শিশু পার্টি বলে উপহাস করছেন। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। যাদের কারণে আজ আপনাদের এই গদি, তাদের নিয়ে আপনারা উপহাস করছেন। এই জাতি ঠিকই আপনাদের কাছ থেকে পাওনা বুঝিয়ে নেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। আপনারা জাতিকে ধোঁকা দিয়েছেন এবং ইতিমধ্যে তা স্বীকারও করে নিয়েছেন। আপনাদের নেতাই বলেছিলেন যে, আমরা যদি ধোঁকা দেই, আগামীতে জনগণ আমাদেরকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে। সেই আস্তাকুঁড় দেখার জন্য এখন আপনাদের তৈরি হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করার মানে হচ্ছে এদেশের মানুষকে অপমান করা, তাদেরকে অস্বীকার করা এবং তাদের রায়ের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো। জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অতীতে কেউ রেহাই পায়নি, আপনারাও পাবেন না। সময় থাকতে তিনি সরকারকে সৎ পথে ফিরে আসার এবং জাতির সঙ্গে গাদ্দারি ও বেইমানি না করার অনুরোধ জানান।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার যদি এসে জনগণের কাছে স্বীকার করে যে, তারা ভুল করেছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করবে, তবে হয়তো জনগণ তাদের ক্ষমা করতে পারে।

সংসদ ও সরকারের মেয়াদের কথা উল্লেখ করে জামায়াতের আমীর বলেন, এই সংসদের মেয়াদ মাত্র আড়াই মাস পার হলো। আমরা চাইনি এখনই আপনাদের শক্ত করে ধরতে। আমরা সুযোগ দিতে চেয়েছি যাতে আপনারা আপনাদের ভুলগুলোকে সংশোধন করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, আমাদের এই উদারতাকে কোনো দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করবেন না। আপনারা ভালো কাজ করবেন, আমরা পানির মতো তরল হবো। আর মন্দ ও অন্যায় কাজ করে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন, সেদিন আমরা ইস্পাতের চাইতেও কঠিন হয়ে দাঁড়াবো।

দেশ এবং জনগণের কোনো ক্ষতি আমরা কোনোভাবেই মেনে নেবো না। পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ আমাদের প্রতিবেশী এবং আমরা প্রতিবেশীকে সম্মান করি। আমরা চাই, আপনারা শান্তিতে থাকুন এবং আপনাদের দেশের ভেতরে মানবিক পরিবেশ তৈরি হোক। আমরা চাই না ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে বিভাজন এবং অশান্তি হোক। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি সেখানে শুধু মুসলিম নামের পরিচয়ে মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের দিকে লাল চোখ দেখানো হচ্ছে। এই বাংলাদেশের দিকে চোখ রাঙাবেন না এবং কোনো হুমকি-ধমকি দেবেন না। আমরা নিজেরাও শান্তিতে থাকতে চাই এবং আপনারাও শান্তিতে থাকুন। আমাদের শান্তি নিয়ে টান দিলে কারও শান্তি থাকবে না।

আঞ্চলিক পানির সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের চার ভাগের এক ভাগ অঞ্চল আজ পদ্মা এবং তিস্তার কারণে মরুভূমি হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের প্রথম সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু ৫৫ বছরেও সেই ১৫ দিন শেষ হয়নি। ফলে পদ্মা শুকনা মৌসুমে মরুভূমি আর বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন কৃষকের পানির প্রয়োজন হলেও পানি নেই। সরকার পদ্মা ব্যারেজের যে ঘোষণা দিয়েছে তার জন্য আমরা সাধুবাদ জানাই, তবে এই ঘোষণা যেন শুধু লোক দেখানো না হয় এবং বাস্তবে রূপ নেয়।

জামায়াত আমীর বলেন, তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পাড়ের আড়াই কোটি মানুষের দুঃখ দুর্দশা দূর করার জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।

সমাপনী বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার ইতিমধ্যে যে অপকর্মগুলো করেছে এবং জাতিকে যে ধোঁকা দিয়েছে, বিশেষ করে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ১৬টি অধ্যাদেশ তারা ফেলে দিয়েছে। এগুলো যদি তারা বাস্তবায়ন না করে, তবে আমাদের আন্দোলন সংসদে এবং রাজপথে একসঙ্গে চলবে। গণভোটের রায় বাংলাদেশে অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে এবং বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করা হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হলে দেশে সুশাসনের পথ সুগম হবে, না হলে অতীতের চেয়েও ভয়াবহ স্বৈরশাসন জাতির ঘাড়ে চেপে বসবে। জান দেবো কিন্তু দেশের মান দেবো না- এই শপথ নিয়ে সমাজ বদলে দেয়ার জন্য তিনি সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি ও রাজশাহী অঞ্চল পরিচালক মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি’র সভাপতিত্বে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন- লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, জয়পুরহাট জেলার আমীর মো. ফজলুর রহমান সাঈদ এমপি, পাবনা জেলার আমীর অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল এমপি, রাজশাহী মহানগরীর আমীর ড. মো. কেরামত আলী এমপি, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর মাওলানা আব্দুল কাইউম সুবহানী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর অধ্যাপক সিরাজুল হক, এনসিপি’র মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

সিরু

২ মাস আগে

বাংলাদেশে রাজাকার শফিকদের খায়েস কখনও পুরন হবে না।

মন্তব্য করুন