ঘটনায় শ্রমিকদের সম্পৃক্ততার সুযোগই ছিল না। জগন্নাথপুর লাইনের মালিকদের দ্বন্দ্ব। অথচ এই দ্বন্দ্বে শ্রমিকরা বিভক্ত হয়ে সংঘর্ষে জড়ালো। প্রাণ গেল হতভাগা দুই শ্রমিকের। এখন পাল্টাপাল্টি মামলা। কেন এই পরিস্থিতি। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন খোদ টার্মিনাল সংশ্লিষ্টরা। কাঠগড়ায় হাজী ময়নুল ইসলাম ও আব্দুল মুহিম। ময়নুল সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মুহিম সেক্রেটারি। পাল্টাপাল্টি মামলায় দু’জনই এখন হত্যা মামলার আসামি। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, খুনের হোলি খেলা, হত্যা মামলা সব হওয়ার পরও এখনো প্রকাশ্যে শ্রমিক নেতারা।
সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ঘটনার সূত্রপাত সিলেট-বিশ্বনাথ-জগন্নাপুর সড়কের মালিক সমিতির কর্তৃত্ব নিয়ে। এ রুটের মালিকদের দীর্ঘদিনের নেতা ছিলেন বিশ্বনাথ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সুহেল আহমদ চৌধুরী। কয়েক মাস আগে সুহেল মারা যান। এ রুটে গাড়ি বেশি শাহজাহানের।
সুহেলের জীবদ্দশায় শাহজাহান নীরবই ছিলেন। কিন্তু সুহেলের মৃত্যুর পর শাহজাহান এই রুটের কর্তৃত্ব নেয়ার চেষ্টা করেন। এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান সুহেল অংশের সাবেক মালিক নেতারা। তাদের নেতৃত্ব দেন সংগঠনের সচিব মনির আলী। তিনি ফ্রন্টলাইনে নিয়ে আসতে চাইছেন মরহুম সুহেলের ভাইকে। এ নিয়ে উভয়পক্ষই পাল্টাপাল্টি সাধারণ সভা করেছেন। পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনের পর্যায়েও গেছেন। বিষয়টি নজরে আসে জেলা পরিবহন মালিক সমিতির। এ নিয়ে গত ২৭শে এপ্রিল টার্মিনালে মুখোমুখি হয় দু’পক্ষ। এই দু’পক্ষে অবস্থান নেন জেলা পরিবহন মালিক সমিতির দুই নেতা। সমিতির সভাপতি হাজী ময়নুল অবস্থান নেন মনির অংশের দিকে ও সাধারণ সম্পাদক মুহিম অবস্থান নেন শাহজাহানের পক্ষে।
ওইদিন সকাল থেকে টার্মিনালে উত্তেজনা ছড়ালে সেখানে যান জেলা মালিক সমিতির নেতারা। তারা উভয়পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন- অধীনস্থ সমিতি নিয়ে বিরোধ থাকায় জেলা মালিক সমিতির নেতারা পুরো ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছে। পরবর্তীতে বসে জেলা মালিক সমিতির নেতারা বিষয়টির সমাধান দেবেন। দুপুর ১২টার দিকে এ সিদ্ধান্ত দিয়ে মালিক সমিতির নেতারা টার্মিনাল ত্যাগ করেন। তারা চলে আসার প্রায় দুই ঘণ্টার পর উভয়পক্ষের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল ছোড়া হয়। এতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছিল না পুলিশ। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
খবর পেয়ে টার্মিনালে যান সিটি প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে সবাইকে শান্ত করে দিয়ে আসেন। ঘটনায় আহত সিলেট-জকিগঞ্জ রুটের শ্রমিক রিপন আহমদ ও দেলোয়ার হোসেন ৫ই মে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। পর পর দুটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ায় বিষয়টিতে আইনি উদ্যোগ নেয়া হয়। এ ঘটনায় নিহত রিপনের পিতা গোলাপগঞ্জের রণকেলী গ্রামের ছাবলু মিয়া বাদী হয়ে ছেলে হত্যায় জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল হক কয়েকজনকে আসামি করে দক্ষিণ সুরমা থানায় মামলা দায়ের করেন। আর শ্রমিক দেলোয়ার হত্যা মামলায় তার পিতা বিয়ানীবাজারের বাগবাড়ি গ্রামের আজির উদ্দিন বাদী হয়ে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুহিমসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
যে দুই শ্রমিক মারা গেছে একই রুটের। একই অংশের। পাল্টাপাল্টি মামলায় আসামি শ্রমিক নেতারা। পুলিশ আইন মতো কাজ করেছে। এতে ক্ষেপেছেন সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ময়নুল অংশের নেতারা। তারা গত বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির জরুরি সভায় মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন শ্রমিক কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। একইসঙ্গে তারা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে আব্দুল মুহিমকে বহিষ্কার করেছেন। দ্বন্দ্ব শ্রমিকদের। মারা গেল শ্রমিক। হলো মামলা। এখন মামলা প্রত্যাহারে ধর্মঘটের আহ্বান। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত সিলেটের প্রশাসন।
বিষয়টি নিয়ে হস্তক্ষেপ করছেন বাংলাদেশ পরিবহন মালিক ফেডারেশনের সিলেট বিভাগীয় নেতারা। এ নিয়ে দু’একদিনের মধ্যে তারা পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। ওই সংগঠনের সিলেট বিভাগীয় সেক্রেটারি আবেদ সুলতান চৌধুরী মানবজমিনকে জানিয়েছেন- হত্যার বিচার হতেই হবে। সেটি আইন দেখবে। প্রকৃত দোষীরা যেন ছাড় না পায়- সেই দাবি আমাদের। আর যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় তাদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য আমরা পুলিশকে বলবো। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ আছে। এটি পর্যালোচনা করে যদি দেখা যায় পরিবহন শ্রমিকদের শীর্ষ নেতারা জড়িত নয় তাহলে আমরাও প্রশাসনকে তাদের ব্যাপারে অনুরোধ করবো।
এদিকে ঘটনার জন্য জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হাজী ময়নুল ইসলাম জানিয়েছেন- আমি কোনো পক্ষাবলম্বন করিনি। অথচ আসামি করা হয়েছে। ঘটনায় তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিলেন বলে জানান। তবে তার অংশের নেতারা জানিয়েছেন- ৭ লাখ টাকায় ম্যানেজ হয়ে মালিক সমিতি দখলে নিতে সেক্রেটারি মুহিম তার দলবল নিয়ে হামলা করেছেন। তার কারণেই মূলত এ ঘটনা ঘটেছে। জেলার শ্রমিক সেক্রেটারি আব্দুল মুহিম জানিয়েছেন- কী ঘটেছে সেটি তিনি এখনো বুঝতে পারছেন না। কেন শ্রমিকরা এতে দ্বন্দ্বে জড়ালো বিষয়টি তার অজানা। এ নিয়ে সভাপতি ময়নুলের সঙ্গে তার কথা হয়েছে।
আপাতত কিছুদিন নীরব থাকার জন্য সভাপতি তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান। শ্রমিকরা জানিয়েছেন- টার্মিনালে যেকোনো দ্বন্দ্বে শ্রমিকদের ব্যবহার করা হয়। এবারো তাই হয়েছে। কিন্তু দুই শ্রমিক নিহত হওয়ায় এ নিয়ে তুমুল অস্থিরতা চলছে। শ্রমিক নেতারা শুরু থেকেই নিরপেক্ষ থাকলে দুটি প্রাণ ঝরে যেতো না বলে জানিয়েছেন তারা।
