সমপ্রতি একটি জাতীয় পত্রিকায় ‘পাত্রী চাই’- শিরোনামে নিম্নোক্ত বিজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হয়েছে-
‘পিতা অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ ডিফেন্স অফিসার (৭ বার হজ ও ওমরাহ্ সম্পন্নকারী), মাতা-গৃহিণী (৪ বার হজ ও ওমরাহ্ সম্পন্নকারী), তাদের একমাত্র পুত্র-ধার্মিক (৪ বার হজ ও ওমরাহ্ সম্পন্নকারী), সিএইচ (নর্থ সাউথ), আইআর (ঢাবি), ব্যাংকার, বয়স ৩০.৯ বছর, উচ্চতা ৫ ফিট সাড়ে ৮ ইঞ্চি, এক বোন (ছোট/অবিবাহিত), বসুন্ধরায় স্থায়ী। পাত্রের মৃত নানা বিশিষ্ট জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠিত ছিলেন (উত্তরা ৩নং সেক্টরে সুপরিচিত মার্কেট কমপ্লেক্স ও গুলশান-২ এ বাড়ি)। ঢাকায় স্থায়ী পরিবারের ধার্মিক-হিজাবী, অতিসুন্দরী, লম্বা (কমপক্ষে ৫ ফিট ৪ ইঞ্চি), স্লিম, বিনয়ী, সাংসারিক (চাকরিহীন), বয়স ২২-২৬ পাত্রী চাই।’
একটি খবরের কাগজের সামান্য কয়েকটি লাইন কখনো কখনো গোটা সমাজের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর দলিল হয়ে ওঠে। আলোচ্য বিজ্ঞাপনটি তেমনই একটি সামাজিক দলিল, যেখানে আধুনিক সমাজের গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট, শ্রেণিগত অহংকার, ধর্মীয় প্রতীকীতা এবং পিতৃতান্ত্রিক কল্পনা একসঙ্গে উন্মোচিত হয়েছে।
বিবাহ এখানে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক মর্যাদা, পুঁজির বিনিময় এবং শ্রেণিগত সামঞ্জস্যের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্প। মানুষ এখানে ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত নয়; বরং সে একটি সামাজিক ‘প্রোফাইল’-যার মূল্য নির্ধারিত হয় শিক্ষা, পেশা, সম্পত্তি, বংশ এবং ধর্মীয় প্রদর্শনের মাধ্যমে।
‘উচ্চপদস্থ ডিফেন্স অফিসার’, ‘ব্যাংকার’, ‘নর্থ সাউথ’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘গুলশান-২’, ‘বসুন্ধরা’- এই নামগুলো কেবল তথ্য নয়; এগুলো একেকটি সামাজিক মর্যাদার কোড। এখানে সম্পর্কের ভিত্তি প্রেম বা পারস্পরিক বোঝাপড়া নয়; বরং সামাজিক পুঁজি ও শ্রেণিগত সামঞ্জস্য।
একইভাবে ধর্ম এখানে আত্মিকতা থেকে সরে এসে একটি প্রদর্শনযোগ্য প্রতীকে রূপ নিয়েছে। ‘সাতবার হজ’, ‘চারবার ওমরাহ্’-এগুলো নৈতিক গভীরতার পরিবর্তে সামাজিক মর্যাদার ভাষা হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় অভিজ্ঞতা এখানে অন্তর্জগতের বিষয় নয়; বরং বহির্জগতের প্রদর্শনী।
এই বিজ্ঞাপনকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতার ঘনীভূত রূপ্তযেখানে আধুনিকতার বাহ্যিক রূপ (শিক্ষা, কর্পোরেট পেশা, অভিজাত আবাসন) এবং সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা একসঙ্গে সহাবস্থান করছে।
১. ‘হাইপার-রিয়েলিটি’ এবং ধর্মের পণ্যকরণ
বিজ্ঞাপনটির সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হলো-হজ ও ওমরাহ্ পালনের সংখ্যাগত ঘোষণা (৭ বার, ৪ বার)। ধর্ম যেখানে মূলত আত্মশুদ্ধি, বিনয় ও অন্তর্লোকের সাধনার বিষয়, সেখানে এখানে তা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে।
পিয়ের বোঁদিয়ের (Pierre Bourdieu) ধারণা অনুযায়ী, এটি ‘রিলিজিয়াস ক্যাপিটাল’-এর সামাজিক রূপান্তর- যেখানে ধর্মীয় অনুশীলন অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিকতা না হয়ে সামাজিক পুঁজির প্রতীকে পরিণত হয়।
‘সাতবার হজ’, ‘চারবার ওমরাহ’-এসব এখন অভিজ্ঞতা নয়; বরং সামাজিক বাজারে অভিজাতত্বের চিহ্ন। ধর্ম এখানে আত্মিক অভিজ্ঞতা না হয়ে সামাজিক পরিচয় নির্মাণের উপকরণে পরিণত হয়েছে।
২. প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও শ্রেণিগত কোড:
বিজ্ঞাপনে পাত্রের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়-নর্থ সাউথ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংকিং সেক্টর, ডিফেন্স-এবং পারিবারিক ভৌগোলিক অবস্থান (গুলশান, বসুন্ধরা, উত্তরা) একত্রে একটি শ্রেণিগত কোড তৈরি করেছে।
এখানে শিক্ষা ও পেশা কেবল যোগ্যতা নয়; বরং সামাজিক মর্যাদার স্তরচিহ্ন। ব্যক্তি এখানে অনুভব, অভিজ্ঞতা বা নৈতিক সত্তা হিসেবে নয়; বরং একটি সামাজিকভাবে কোডেড পরিচয় হিসেবে উপস্থিত।
ফলে বিবাহ এখানে মানবিক সম্পর্ক নয়; বরং দুটি সামাজিক-অর্থনৈতিক পুঁজির কৌশলগত সমন্বয়।
৩. ট্রফি ওয়াইফ কল্পনা:
বিজ্ঞাপনে পাত্রীর জন্য নির্ধারিত বৈশিষ্ট্য-‘অতিসুন্দরী’, ‘স্লিম’, ‘লম্বা’, ‘হিজাবী’, ‘চাকরিহীন’-নারীকে একটি নির্মিত ও নিয়ন্ত্রিত আদর্শে রূপ দেয়।
এখানে নারীর মূল্য তার চিন্তা, শিক্ষা বা স্বাধীনতায় নয়; বরং দেহ, সৌন্দর্য ও অনুগত্যে। ‘হিজাবী’ ও ‘স্লিম-অতিসুন্দরী’-এই দুইয়ের সহাবস্থান এক ধরনের দ্বৈত নারীত্ব তৈরি করে, যেখানে নারী একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রিত ও ভোগ্য। আর ‘চাকরিহীন’ শর্তটি নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে তাকে নির্দিষ্ট সামাজিক ভূমিকায় আবদ্ধ করে। এই কাঠামোতে নারী মূলত ‘ট্রফি ওয়াইফ’-যিনি প্রদর্শনযোগ্য, কিন্তু স্বতন্ত্র নন।
ফলে বিবাহ এখানে সহযাত্রা নয়; বরং সামাজিকভাবে উপযুক্ত দুই পরিবারের নিয়ন্ত্রিত সমন্বয়।
সামাজিক মননের সংকট:
এই বিজ্ঞাপন আধুনিকতার নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর দ্বন্দ্ব প্রকাশ করে। আধুনিকতা যেখানে ব্যক্তি-মর্যাদা, সমতা ও স্বাধীনতার কথা বলে, সেখানে এখানে সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে শ্রেণি, পুঁজি ও প্রদর্শনের যুক্তিতে।
এটি বাংলাদেশের সামাজিক মননের একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে নির্দেশ করে- যেখানে আধুনিকতা কেবল বাহ্যিক রূপে উপস্থিত, কিন্তু মানসিক কাঠামোতে এখনো সামন্ততান্ত্রিক ও পিতৃতান্ত্রিক যুক্তি সক্রিয়।
ফলে সমাজ এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতায় বাস করছে-একদিকে আধুনিকতার ভাষা, অন্যদিকে প্রাক-আধুনিক ক্ষমতা-চিন্তা।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো-আমরা কি এই ধরনের সামাজিক ভাষা ও বিজ্ঞাপনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেবো, নাকি এর অন্তর্নিহিত মূল্যবোধকে সমালোচনার মাধ্যমে পুনর্গঠন করবো? কারণ সমাজের রুচি একদিনে তৈরি হয় না; এটি ধীরে ধীরে ভাষা, অভ্যাস ও নীরব সম্মতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে।
তাই প্রয়োজন কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা নয়, বরং সম্পর্ক, বিবাহ ও মর্যাদার সংজ্ঞাকে নতুন করে ভাবার একটি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনর্বিন্যাস।
লেখক: গীতিকবি
[email protected]

সওগাত তানসিম খান
২ মাস আগেলেখকের প্রতিটি যুক্তিতে আমি সহমত!