বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ২০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের সুবিধাভোগীদের তথ্য যাচাই করা তা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও সময়োচিত পদক্ষেপ। দীর্ঘ দেড় দশকের ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং ব্যাংকিং খাতের ক্রমাগত অবক্ষয়ের পর এই উদ্যোগ শুধু একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নয়, এটি একটি জাতীয় প্রয়োজনীয়তা। তবে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে এই নীতিমালা কতটুকু কার্যকর হবে এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের করণীয় কী?
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ক্ষতের গভীরতা অত্যন্ত ব্যাপক। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৫ বছরে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা ২৮ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সিংহভাগই ব্যাংকঋণের আড়ালে দেশের বাইরে চলে গেছে। ফলে আজ ২৮টি ব্যাংক মাত্র ছয়টি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কারণে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার করার সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তিযুক্ত নয়, অপরিহার্য।
তবে উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে এই নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়ে একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি রাখাও জরুরি। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং তদারকি সংস্থার জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। একটি দেশে যেখানে বড় ঋণগ্রহীতারা প্রায়শই রাজনৈতিক বলয়ে সুরক্ষিত থাকেন, সেখানে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না বরং সেই তথ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়াই আসল পরীক্ষা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৭ সালের আর্থিক সংকটের পর ব্যাংকিং খাতে আমূল সংস্কার এনেছিল। তারা কর্পোরেট ঋণের বিপরীতে কঠোর জামানত যাচাই, ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ এবং ব্যাংক পরিচালকদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে দ্রুত পরিস্থিতি স্থিতিশীল করেছিল। ভারত তার রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমে 'প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন' বা পিসিএ কাঠামো চালু করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে রেখেছে এবং বড় খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে 'ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্টসি কোড' প্রয়োগ করে কার্যকর ফলাফল পেয়েছে। মালয়েশিয়া ১৯৯৮ সালের সংকটের পর 'দানাহার্তা' নামক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার করে ব্যাংকিং খাতকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। ইন্দোনেশিয়া ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্বে 'ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রাম' চালু করে প্রতিটি বড় ঋণের 'বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ' বা প্রকৃত মালিকানা যাচাইকে বাধ্যতামূলক করেছে।
উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার তত্ত্বাবধানে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য 'সিঙ্গেল সুপারভাইজরি মেকানিজম' চালু করেছে, যেখানে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণ একসাথে চলে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ 'স্ট্রেস টেস্ট' পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলোর ঋণ পোর্টফোলিওর স্থিতিস্থাপকতা যাচাই করে এবং যেকোনো অস্বাভাবিক ঋণ বিতরণে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করে। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সারকথা হলো তথ্য সংগ্রহ নয়, তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণই সংস্কারের মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করতে পারে, যেখানে সব ব্যাংকের বড় ঋণের তথ্য রিয়েল-টাইমে আপডেট হবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় সন্দেহজনক লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত হবে, তাহলে ম্যানুয়াল পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সিঙ্গাপুর ও হংকং এই মডেলে অত্যন্ত সফলভাবে তাদের ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে।
এর পাশাপাশি 'বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ রেজিস্ট্রি' বা প্রকৃত মালিকানার কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা অপরিহার্য। বাংলাদেশে বেনামি ও শেল কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা ভাঙতে হলে প্রতিটি কোম্পানির পেছনের প্রকৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো থাকতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং ডিরেক্টিভ' এবং যুক্তরাজ্যের 'পিপলস সিগনিফিক্যান্ট কন্ট্রোল রেজিস্টার' এ ক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ হতে পারে।
২০২৮ সাল থেকে আইএফআরএস-৯ চালুর যে প্রস্তুতি চলছে, সেটিও অত্যন্ত ইতিবাচক। এই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড ঋণের ঝুঁকি পূর্বানুমান করে সঞ্চিতি রাখার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, যা ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্কভাবে ঋণ বিতরণে অনুপ্রাণিত করবে। তবে এই মানদণ্ড বাস্তবায়নে দক্ষ জনবল তৈরি এবং তথ্য প্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে এখনই বিনিয়োগ শুরু না করলে ২০২৮ সালের সময়সীমা পূরণ করা কঠিন হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, তা হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকসই হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া, বোর্ডের গঠন এবং কর্মকর্তাদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতা বলে, যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে, তখনই ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘস্থায়ী সংস্কার সম্ভব হয়েছে।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ একটি ভালো শুরু, কিন্তু শুধু শুরু। ঋণের তথ্য সংগ্রহ করা এবং জালিয়াতি শনাক্ত করা যদি কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় পরিণত না হয়, তাহলে এই প্রক্রিয়া কেবল কাগুজে সংস্কারেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি যখন বাস্তবে ঋণাত্মক, তখন ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। সেই লক্ষ্যে জবাবদিহির এই সংস্কৃতি গড়ে তোলা শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ এবং ঋণগ্রহীতা সকলের সম্মিলিত নৈতিক দায়।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
