ওয়াশিংটনের দম্ভ, বেইজিংয়ের দাবা: একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার অভিষেক

ওয়াশিংটনের দম্ভ, বেইজিংয়ের দাবা: একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার অভিষেক

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে এমন কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্ত আসে, যখন পুরনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং নতুন এক বিন্যাস জন্ম নেয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতন, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের অবসান কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি প্রতিটি ঘটনাই তার সময়ে বিশ্বের মানচিত্র নতুন করে এঁকেছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে এসে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা অনুভব করছেন, আমরা হয়তো আরেকটি সেই রকম ঐতিহাসিক পালাবদলের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বেইজিং থেকে ফিরে "চমৎকার" বাণিজ্য চুক্তির গল্প শোনাচ্ছেন, তখন বিশ্বের বিশ্লেষকরা ভিন্ন এক সত্য দেখছেন চীন আর কোনো উদীয়মান শক্তি নয়, সে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সমকক্ষ এক বৈশ্বিক পরাশক্তি, যে নিজের শর্তে কথা বলতে শিখেছে।

বাণিজ্যযুদ্ধ: চাপের রাজনীতি বনাম কৌশলগত ধৈর্য

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে চীনের উপর আরোপিত ১৪৫ শতাংশ শুল্ক ছিল মূলত একটি অর্থনৈতিক আধিপত্যের বার্তা। ওয়াশিংটনের হিসাব ছিল সরল চাপ দাও, বেইজিং নমনীয় হবে। কিন্তু বেইজিং সেই হিসাব উল্টে দিয়েছে। পাল্টা ১২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে চীন প্রমাণ করেছে, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের খেলায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কম দক্ষ নয়। শুধু তাই নয়, চীন এই বাণিজ্যযুদ্ধকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সংঘাত হিসেবে না দেখে বৈশ্বিক কূটনীতির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইউরোপ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে কাছে টেনে চীন বুঝিয়ে দিয়েছে আমেরিকার বিকল্প আছে, এবং সেই বিকল্পের নাম বেইজিং।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বৈশ্বিক বাণিজ্যে ০.২ শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে। কিন্তু এই সংকোচনের ভার সমানভাবে পড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, সাধারণ ভোক্তারা চাপে পড়েছেন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন অবশ্য ক্ষতির বাইরে নয়, কিন্তু দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের শক্তি তাকে এই ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা দিয়েছে। ২০২৫ সালে ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া চীন এখন বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ১৮-১৯ শতাংশ ধারণ করছে এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি সভ্যতার পুনরুত্থানের ঘোষণা।

রেয়ার আর্থ: যে অস্ত্রের কথা পশ্চিম ভুলে গিয়েছিল

আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তিগত সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে বিরল খনিজ সম্পদের উপর। স্মার্টফোন থেকে ইলেকট্রিক গাড়ি, যুদ্ধবিমান থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ সবকিছুতেই লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিওডিমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়ামসহ অসংখ্য দুর্লভ উপাদানের প্রয়োজন। বিশ্বের এই বিরল খনিজের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। এটি কোনো দুর্ঘটনাক্রমে হয়নি দশকের পর দশক ধরে সুচিন্তিত বিনিয়োগ ও কৌশলগত পরিকল্পনার ফল এটি। ট্রাম্পের বেইজিং সফরে এই ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রে আসাটা প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে তার প্রযুক্তি শিল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়। চীন এই সুবিধাটিকে একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, যার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের কাছে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিষেধক নেই।

বেল্ট অ্যান্ড রোড: সাম্রাজ্য গড়ার নতুন ভাষা

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একসময় রেলপথ ও সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে বিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল। চীন সেই একই কৌশল নিয়েছে, তবে আরও পরিশীলিত ও আধুনিক রূপে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ১৫০টিরও বেশি দেশে বন্দর, মহাসড়ক, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে বেইজিং। এই বিনিয়োগ কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি রাজনৈতিক আনুগত্যেরও বীজ বপন করছে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন মিলিয়ে চীন এমন একটি সমান্তরাল বৈশ্বিক আর্থিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলছে, যেখানে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের প্রয়োজন পড়ে না। ২০২৫ সালে ১৪টি দেশকে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক কৌশলেরই অংশ বিশ্বকে বলছে, উন্মুক্ততা ও সহযোগিতার প্রতীক এখন শুধু ওয়াশিংটন নয়, বেইজিংও।

সামরিক শক্তি: ব্যবধান কমছে দ্রুতগতিতে

সামরিক সক্ষমতার বিচারে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে আছে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট, বিমানবাহী রণতরী, বৈশ্বিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক এখনো অতুলনীয়। কিন্তু চীনের সামরিক আধুনিকায়ন এমন গতিতে এগোচ্ছে, যা ওয়াশিংটনের পেন্টাগন বিশেষজ্ঞদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত যুদ্ধাস্ত্র, সাইবার যুদ্ধ সক্ষমতা এবং মহাকাশ প্রতিরক্ষায় চীন এমন কিছু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা প্রচলিত সামরিক হিসাবনিকাশকে চ্যালেঞ্জ করছে। তাইওয়ান প্রশ্নটি এই প্রেক্ষাপটে কেবল একটি আঞ্চলিক বিরোধ নয় এটি একটি বৈশ্বিক পরীক্ষা, যেখানে প্রশ্ন হলো পশ্চিম কতটুকু ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত এবং চীন কতটুকু দৃঢ়। দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ ও সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির মাধ্যমে বেইজিং ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, সে তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় পিছিয়ে আসার পাত্র নয়।

ডলারের আধিপত্য: ভাঙছে কি একচেটিয়া শাসন?

বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস হলো ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য। পেট্রোডলার ব্যবস্থা, আইএমএফের ঋণ কাঠামো এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের একক মুদ্রার ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি সুবিধা দিয়েছে, যা কোনো অন্য দেশের নেই। কিন্তু চীন এই একচেটিয়া ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে। ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ছে, ডিজিটাল ইউয়ানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, এবং রাশিয়া-ইরানসহ একাধিক দেশ ডলারবহির্ভূত লেনদেনের পথে হাঁটছে। এটি রাতারাতি ডলারের পতন ঘটাবে না, কিন্তু ধীরে ধীরে একটি বহুমেরু আর্থিক ব্যবস্থার দিকে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে এবং সেই যাত্রার পথপ্রদর্শক হচ্ছে বেইজিং।

উন্নয়নশীল বিশ্ব: দুই পরাশক্তির মাঝে কোন পথে?

এই পরিবর্তনশীল বিশ্বে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে একটি জটিল কৌশলগত প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানির উপর নির্ভরতা, অন্যদিকে চীনের বিনিয়োগ, অবকাঠামো সহযোগিতা এবং ঋণের আকর্ষণ। দুই পরাশক্তির এই দ্বন্দ্বে কোনো একটি পক্ষ নেওয়া মানে অন্যটিকে হারানো এই বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই একমাত্র বুদ্ধিমানের পথ। কিন্তু সেই ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে, কারণ দুই পরাশক্তিই এখন স্পষ্ট আনুগত্য দাবি করছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ যে "হেজিং" কৌশল অনুসরণ করছে অর্থাৎ কোনো এক পক্ষে সম্পূর্ণ না গিয়ে উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও সেটি একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত।

ট্রাম্পের "ফ্যান্টাস্টিক ডিল": বাস্তবতা কতটুকু?

ট্রাম্প যখন বেইজিং থেকে ফিরে "চমৎকার চুক্তি"র দাবি করেন, তখন প্রশ্ন ওঠে এই চুক্তিতে কে বেশি লাভবান হলো? ইতিহাস বলছে, চীন কখনো আলোচনার টেবিলে তাড়াহুড়ো করে না। দাবা খেলার মতো তারা কয়েক চাল আগে ভেবে পদক্ষেপ নেয়। যদি চীন কিছু ছাড় দিয়েও থাকে, তার বিনিময়ে সে নিশ্চিতভাবেই এমন কিছু পেয়েছে যা দীর্ঘমেয়াদে তার কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। ট্রাম্পের "বিজয়" ঘোষণা তাই অনেকটা সেই গল্পের মতো, যেখানে এক খেলোয়াড় ভাবছেন তিনি জিতেছেন, কিন্তু বিজ্ঞ প্রতিপক্ষ জানে আসল খেলা এখনো শেষ হয়নি।

ইতিহাসের রায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে একমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, যেখানে ওয়াশিংটনের কথাই ছিল শেষ কথা সেই যুগের সূর্য অস্তমিত হচ্ছে। এটি কোনো আবেগের কথা নয়, এটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার স্বীকৃতি। চীনের উত্থান, রাশিয়ার আঞ্চলিক দৃঢ়তা, ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং গ্লোবাল সাউথের নতুন আত্মবিশ্বাস মিলিয়ে এমন একটি বহুমেরু বিশ্ব তৈরি হচ্ছে, যেখানে কোনো একটি দেশ একা সব নিয়ম নির্ধারণ করতে পারবে না। এই নতুন বিশ্বে টিকে থাকতে হলে প্রতিটি দেশকে বড় হোক বা ছোট নিজের শক্তি চিনতে হবে, নিজের স্বার্থ বুঝতে হবে এবং কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পথ চলতে হবে।

বেইজিং সেই পথ চিনেছে অনেক আগেই। ট্রাম্পের "ফ্যান্টাস্টিক ডিল" তার প্রমাণ নয়, বরং সেই বাস্তবতার স্বীকৃতি। ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে যাচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে চীন শুধু উঠে দাঁড়ায়নি, সে সমান উচ্চতায় দাঁড়িয়ে বিশ্বকে বলছে: এই মঞ্চে আমার আসন আমিই নির্ধারণ করব।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন