৯ মাসের আয়েশা নানি জান্নাতুল ফেরদাউসের কোলে কাতরাচ্ছে। পাশে বসে আছেন আয়েশার মা। রাজধানীর পোস্তগোলা থেকে শিশুটিকে ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি করেন তারা। টানা দু’দফায় হামে আক্রান্ত হয় শিশুটি। প্রথমবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হলে বাসায় নেয়ার পর ফের হামের উপসর্গ দেখা দেয়। পরে আবার ভর্তি করাতে হয় হাসপাতালে। জান্নাতুল ফেরদাউস বলেন, আয়েশা এখন অক্সিজেন সাপোর্ট ছাড়া নিঃশ্বাস নিতে পারে না। সে যখন অসুস্থ ছিল- জ্বর ছিল, আর ঠান্ডা, নিঃশ্বাস নিতে পারতো না। তারপরে মিটফোর্ড হাসতাপালে ভর্তি করাই। ভর্তি করার পরে আটদিন ছিলাম আমরা। চারদিন আইসিউতে ছিল, চারদিন বেডে ছিল। তারপরে সুস্থ হয়ে যায়। সুস্থ হওয়ার পরে গত ২ তারিখ হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে দেয়। তিনি বলেন, সুস্থ হওয়ার পরে ছোট ছোট ঘামাচির মতো কিছু উঠতে থাকে শরীরে। শুরুতেই ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে খাওয়ানো হয়, ফলে সেগুলো চলে যায়। দু’দিন আগে আবার জ্বর ওঠে। তাই ডিএনসিসি হাসপাতালে নিয়ে আসতে হয়েছে। আয়েশার মতোই অসংখ্য শিশু হাসপাতালটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাতরাচ্ছে।
সরজমিন ডিএনসিসি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ার্ড এবং কেবিনগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডে শিশুদের সঙ্গে এক থেকে দুইজন করে অভিভাবক থাকতে পারছেন। ওয়ার্ডের ভেতরে দেখা যায়, সবগুলো ওয়ার্ড রোগীতে পূর্ণ। ওয়ার্ডের ভেতরে থেকে থেকে শিশুরা কেঁদে উঠছে। সংক্রমক হলেও শিশুদের মা-বাবা কিংবা অভিভাবকরা তাদের কোলে নিয়ে সেবা করছেন। ওই হাসপাতালটির সব রোগীই হামের।
ডিএনসিসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্যমতে, শুক্রবার হাসপাতালের আইসিইউতে ৫২ জন হাম রোগী ভর্তি ছিল। যেখানে ২১২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। ২৮৮টি এইচডিইউ শয্যার মধ্যে ১০১টিতে রোগী ছিল। ৫৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ডের শয্যার মধ্যে ২৬৯টি শয্যায় হামের রোগী ভর্তি ছিল। অর্থাৎ, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত হাসপাতাটিতে ৪২২ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল। তারমধ্যে অধিকাংশই মেয়ে শিশু। ৯০ জন ছেলে শিশু।
পাবনা থেকে শিশু সন্তানকে নিয়ে এসে ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি করেন সিদ্দিক। তার স্ত্রীর কোলে ৮ মাসের শিশু সিফাত। মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। সিদ্দিক বলেন, আমার বাচ্চার শ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। আমরা কান্নাকাটি করলাম আল্লাহর কাছে। এখানে তিনদিন আইসিইউতে ভর্তি ছিল। এখন অবস্থা অনেকটা উন্নতির দিকে। এর আগে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়েছি, ওখানকার চিকিৎসা এতো নিম্ন্নমানের সব অদক্ষ নার্স এবং ভালো কোনো চিকিৎসক পাওয়া যায়নি। পরে সেখান থেকে সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি। সিদ্দিক বলেন, সিফাতের প্রথমে জ্বর আসে। কোনো কিছু খেতে পারতো না। পরে শরীরে র্যাশ উঠতে থাকে। তখন ছেলেটি একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে। শরীর ফুলে যায়। তখন পাবনা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ওখানে ছেলের অবস্থা অবনতি হলে অক্সিজেন দিয়ে এম্বুলেন্সযোগে ঢাকা মেডিকেল নিয়ে আসি। সেখান থেকে ডিএনসিসি হাসপাতালে নিয়ে আসি।
মাতুয়াইলের একটি হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল, সেখানে থেকে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভর্তি শামিম। বয়স ২০ মাস। মা জেসমিন মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে শামিমকে। টানা ৭ দিন ধরে অসুস্থ। জেসমিন বলেন, আমার ছেলে প্রচুর কান্না করে। কান্না থামানো যায় না। শ্বাসকষ্ট হয়। শুরুতেই অনেক কষ্ট হতো, জ্বর অনেক। কাশতে কাশতে দম আটকে যেতো। জেসমিন বলেন, প্রথমে ওকে মাতুয়াইলে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে ডাক্তাররা হামের কথা জানান। পরে ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যাই। পরে এখানে আসছি।
ডিএনসিসি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ৫ মাস বয়সের ঈসা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ঈসার মামা আলমাস তালুকদার। তিনি বলেন, ঈসার শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। ফরিদপুর থেকে সরাসরি ঢাকায় নিয়ে আসতে হয়েছে। এখানে আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়েছে। তবে এখন আগের চেয়ে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
ওদিকে, শুক্রবার বিকালে ডিএনসিসি হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এ সময় মন্ত্রী বলেন, মায়েদের শরীরে পুষ্টির অভাবে বাচ্চারা পুষ্টি পাচ্ছে না, ব্রেস্টফিডিং কম হচ্ছে। সিজারিয়ান বাচ্চাদের মায়ের শাল দুধ খাওয়ানো হচ্ছে না। তাই বিভিন্ন কারণে বাচ্চারা পুষ্টি নিয়ে গ্রোথ করতে পারছে না। যার জন্য হাম বেশি আক্রমণ করছে।
তিনি বলেন, গ্যাভি, ইউনিসেফ এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) নিজেরাই বলেছে, ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে এত বিশাল একটা জনসংখ্যার জন্য এত ত্বরিত গতিতে এত প্রচুর ভ্যাকসিন আর কোনো দেশ জোগাড় করতে পারেনি, যেটা আমরা করেছি। আমাদের চিকিৎসকরা অনেক পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। একটা ভেন্টিলেটরও বিগত সরকার রেখে যায়নি, আমাদের হাতে একটা হামের ভ্যাকসিন রেখে যায়নি। শূন্য হাতে যাত্রা করেছি।
