প্রবাসের তপ্ত মরুভূমিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন ছিল চার সহোদরের। অভাবের সংসারে সচ্ছলতার আলো ফেরাতে একে একে ওমান পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল ওমানের মাস্কাটের অদূরে এক নীরব সড়কে। ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি ব্যক্তিগত গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এই চার ভাইয়ের নিথর দেহ। একসঙ্গে চার সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাথর মা; ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার, স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো রাঙ্গুনিয়া। যে স্বপ্ন ছিল পরিবারের ভাগ্য বদলের, সেই স্বপ্নই আজ রূপ নিয়েছে গভীর শোকে-প্রবাস থেকে ফিরছেন তারা কফিনবন্দি হয়ে।
মঙ্গলবার রাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারান চার ভাই। নিহতরা হলেন- রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দোরাজপাড়ার প্রয়াত মোহাম্মদ হাসানের ছেলে রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, মো. সিরাজ ও মো. শহিদ। সূত্রমতে, অসুস্থ বড় ভাই রাশেদুলকে ডাক্তার দেখাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকার একটি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছিলেন শাহেদুল, সিরাজ ও শহিদ। কিন্তু চিকিৎসকের সিরিয়াল পেতে দেরি হওয়ায় তারা গাড়ির ভেতরেই এসি চালিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
গাড়ির ভেতর জমে ওঠা বিষাক্ত গ্যাসে যখন তারা নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলেন, তখন শেষ চেষ্টায় সিরাজ তার এলাকার প্রবাসী বন্ধু পারভেজকে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলা সেই আর্তনাদ ছিল এমন- ‘পারভেজ তুরা কোথায়? তুর কাছে গাড়ি আছে না? থাকলে একটু মুলাদ্দা আয়। আমার বদ্দাকে (বড় ভাইকে) ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছি। এখন আমরা গাড়ি থেকে নামতে পর্যন্ত পারছি না, আমরা চারজনও পারছি না, কাউকে নিয়ে আসো।’ সেই আকুতি পারভেজের কাছে পৌঁছালেও ততক্ষণে চার ভাইয়ের প্রাণবায়ু নিভে গেছে। এই ভয়েস রেকর্ড এখন ভাইরাল হয়ে ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় গাড়িটি চালু অবস্থায় স্থির থাকার কারণে এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস গাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই গ্যাস শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করায় তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে পুলিশ। নিহতদের মরদেহ বর্তমানে স্থানীয় পুলিশের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বান্দোরাজপাড়ায় গিয়ে দেখা যায় এক শোক স্তব্ধ জনপদ। স্বজন হারানোর বেদনায় বাকরুদ্ধ একমাত্র জীবিত ভাই এনাম। অসুস্থ মা ফরিদা বেগমকে এখনো পুরো ঘটনার ভয়াবহতা জানানো হয়নি। তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে বাড়ির ভেতরে বাইরের লোকজনের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়েছে। তবুও নিহতদের বাড়ির সামনে প্রতিদিন ভিড় করছেন শত শত মানুষ। যে উঠানে কয়েকদিন পর বিয়ের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই আহাজারি আর শোকের মাতম।
ছোট ভাই মো. এনাম জানান, পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চারজনই দীর্ঘদিন ধরে ওমানে প্রবাসজীবন কাটাচ্ছিলেন। তিনি নিজে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি একটি কম্পিউটার দোকান পরিচালনা করেন। নিহতদের মধ্যে সিরাজ ও শহিদ ছিলেন অবিবাহিত। আগামী ১৫ই মে তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। দেশে ফেরার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কেনাকাটার জন্য চার ভাই একসঙ্গে বের হয়েছিলেন। এর মধ্যেই বড় ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে ঘটে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। তাদের খালাতো বোনজামাই মো. সাগরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কিছুক্ষণ আগে পুলিশের মাধ্যমে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেয়েছি। এসির বিষাক্ত কোনো গ্যাসের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
লালানগর ইউপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আমির হোসেন বলেন, এই শোক সইবার মতো নয়। একটি পরিবারের চারজন কর্মক্ষম যুবক এভাবে মারা যাবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর রাফিউল ইসলাম জানান, স্পন্সরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ শেষ হলে আগামী সোমবার অথবা মঙ্গলবারের মধ্যে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’
