বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে মধ্যপ্রাচ্য যখন আবারও উত্তপ্ত, তখন বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে হঠাৎ করে উষ্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সাম্প্রতিক বৈঠক ও পারস্পরিক ইতিবাচক বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের ভাবিয়ে তুলেছে—এই নতুন সমীকরণ কি ইরান যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে?
আজকের বিশ্বে কোনো যুদ্ধ কেবল একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। ইউক্রেন যুদ্ধ যেমন ইউরোপের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য রুট এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নতুন সংকটে ফেলেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি জীবন-মরণ প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। কারণ বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
সাম্প্রতিক বেইজিং বৈঠকে ট্রাম্প ও শি উভয়েই হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন এবং ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে সে বিষয়েও এক ধরনের অভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছেন।
এই অবস্থান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ইরান প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করেছে। ওয়াশিংটন যেখানে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং আঞ্চলিক জোটের ওপর নির্ভর করেছে, সেখানে বেইজিং বরাবরই অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং নীরব প্রভাব ব্যবহারের পথ বেছে নিয়েছে। ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা হিসেবে চীনের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চীন যদি সত্যিই তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে, তাহলে যুদ্ধের গতি অনেকটাই বদলে যেতে পারে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—চীন কি আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে? বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কখনোই আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না; এখানে জাতীয় স্বার্থই শেষ কথা। চীনের জন্য ইরান কেবল একটি মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র নয়, বরং “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ”-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম উৎস এবং পশ্চিমা প্রভাব মোকাবিলার কৌশলগত অংশীদার। ফলে বেইজিং একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চাইবে, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কও পুরোপুরি নষ্ট করবে না।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এখন চীনের সহায়তা চাইছে মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, ইরানের ওপর চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। তৃতীয়ত, ওয়াশিংটন বুঝতে পারছে যে এককভাবে এই সংকট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
অন্যদিকে চীনও এই পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত, তখন বেইজিং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। তাই ট্রাম্প-শি সম্পর্কের উষ্ণতা যতটা বন্ধুত্বের প্রতীক, তার চেয়ে বেশি এটি একটি কৌশলগত সমঝোতার ইঙ্গিত।
বেইজিং বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। শি জিনপিং স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে তাইওয়ান প্রশ্নে ভুল পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ চীন ইরান ইস্যুতে সহযোগিতার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তাইওয়ান প্রশ্নে নমনীয়তা চাইতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটিই স্বাভাবিক বাস্তবতা—এক ইস্যুর বিনিময়ে আরেক ইস্যুতে সমঝোতা।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্প-শি উষ্ণতা ইরান যুদ্ধে তাৎক্ষণিক শান্তি না আনলেও সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা, তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং পারমাণবিক উত্তেজনা সীমিত রাখার ক্ষেত্রে দুই শক্তির সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ চীনও চায় না জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হোক। আর যুক্তরাষ্ট্রও চায় না যুদ্ধ এমন পর্যায়ে যাক, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা International Monetary Fund ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র-চীনের “গঠনমূলক সংলাপ”-কে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
কিন্তু এই উষ্ণ সম্পর্ক কতটা স্থায়ী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ ইতিহাস বলে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান ও মানবাধিকার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য এখনো বিদ্যমান। সাম্প্রতিক বৈঠকেও এসব ইস্যু অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
তবু বাস্তবতা হলো, বর্তমান বিশ্বে বড় শক্তিগুলো সংঘাতের মাঝেও সহযোগিতার পথ খুঁজে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
কারণ অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এক দেশের সংকট অন্য দেশের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ইরান যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়; এশিয়া, ইউরোপ, এমনকি আফ্রিকার অর্থনীতিও বিপর্যস্ত হবে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়বে, জ্বালানি সংকট তীব্র হবে এবং বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ। ফলে ট্রাম্প-শি সম্পর্কের প্রভাব কেবল ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রতিফলন পড়বে ঢাকার বাজারেও।
বিশ্ব রাজনীতির একটি বিষয় খুবই সুস্পষ্ট যে—চীন আর আগের মতো কেবল অর্থনৈতিক শক্তি নয়; এখন সে বৈশ্বিক কূটনীতিরও কেন্দ্রীয় খেলোয়াড়। আর ট্রাম্পও বুঝতে পারছেন, চীনকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে ইরান সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ফলে দুই নেতার মধ্যে যে উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে, তা ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে অনেক বেশি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
তবে এটিও সত্য, এই সম্পর্কের ভিত অত্যন্ত ভঙ্গুর। কারণ স্বার্থের সংঘর্ষ শুরু হলেই আবারও উত্তেজনা বাড়তে পারে। তাই ট্রাম্প-শি বৈঠককে নতুন যুগের সূচনা বলা এখনই হয়তো অতিরঞ্জন হবে। বরং এটিকে বলা যায়—সংঘাত এড়ানোর জন্য একটি সাময়িক কৌশলগত সমঝোতা।
ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর নয়; বরং কূটনৈতিক দর-কষাকষি, জ্বালানি রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। আর সেই বাস্তবতায় ট্রাম্প ও শি—দুজনই জানেন, একটি নিয়ন্ত্রণহীন যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। তাই বলা যায়, ট্রাম্প-শি'র উষ্ণতা হয়তো যুদ্ধ বন্ধ করবে না, কিন্তু যুদ্ধকে বৈশ্বিক বিপর্যয়ে রূপ নেওয়া থেকে কিছুটা হলেও থামিয়ে রাখতে পারে। আর বর্তমান অস্থির পৃথিবীতে সেটিই হয়তো সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হয়ে থাকবে শান্তি কামি প্রতিটি মানুষের জন্য।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
