জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথনে ইনু সাহেব বলছেন যে, তিনি এবার ‘জঙ্গি কার্ড’ খেলবেন। এই জঙ্গি কার্ড খেলার অর্থই হচ্ছে যে নির্বিচারে গুলি করে মানুষকে হত্যা করতে হবে এবং তাই হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। আন্দোলনে কুষ্টিয়া জেলায় ৬ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায় যেকোনো দিন। গতকাল ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের এ আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এদিন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এতে মামলার আইনি দিকগুলো তুলে ধরেন তিনি। এ মামলার একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনু।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কথোপকথনের মাধ্যমে কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি ও কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ইনুর বিরুদ্ধে মোট ৮টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে আদালতে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে আসামিপক্ষ তার খালাস চেয়েছে।
ইনুর বিরুদ্ধে ৮টি অভিযোগ: গত বছরের ২৫শে সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশন থেকে ৩৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়েছে। যার সঙ্গে প্রমাণ হিসেবে চার খণ্ডে সাজানো ১,৬৮০ পৃষ্ঠার নথি, ছয়টি ভিডিও এবং তিনটি অডিও রেকর্ডিং যুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া ২০ জন সাক্ষীর তালিকা করলেও মামলায় মোট ৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেয়া হয়েছে।
অভিযোগ-১. হাসানুল হক ইনু গত বছরের ১৮ই জুলাই ভারতীয় গণমাধ্যম ‘মিরর নাও’ এ আন্দোলন দমনে এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করে এবং তাদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের উস্কানি প্রদান করেন। অভিযোগ-২. গত বছরের ১৯শে জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এবং ইনুর উপস্থিতিতে ১৪ দলীয় জোটের সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার “শ্যুট অ্যাট সাইট” সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের জন্য দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন করে নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের গুলি করার নির্দেশ দেয়া হয় এবং তা সরকার কার্যকর করে। যার সঙ্গে ইনুর সম্পৃক্ততা রয়েছে। অভিযোগ-৩. ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে ইনু গত বছরের ২০শে জুলাই দুপুর সোয়া ১২টায় তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রণয়ন ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন এবং পূর্বের নির্যাতনকে অনুমোদন করেন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী এসপি তার অধীন পুলিশ বাহিনী এবং ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ১৮ই জুলাই থেকে শুরু করে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। ৬ জন নিহত হয় এবং রাইসুল হকসহ অসংখ্য নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা আহত হয়, অনেককে আটক করে নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগ-৪. ইনু সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে লেথাল উইপন ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করে ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে তাদেরকে গুলি করে হত্যা, বোম্বিং করে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উস্কানি প্রদান করেন এবং শেখ হাসিনাকে উক্তরূপ নির্দেশ দিতেন।
অভিযোগ-৫. গত বছরের ২৭শে জুলাই হাসানুল হক ইনু নিউজ-২৪ এ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
অভিযোগ-৬. গত বছরের ২৯শে জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় জোটের অন্যতম শরিক ১৪ দল জাসদের প্রধান আসামি ইনু নিজে উপস্থিত থেকে আন্দোলনকে দমন ও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডার কর্তৃক পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দেন। অভিযোগ-৭. ৪ঠা আগস্ট বেলা সাড়ে ৪টায় আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি করে গুলিবর্ষণসহ শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপ অনুমোদন করেন এবং তা কার্যকর করার জন্য হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে উক্ত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তার অধীন তার নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ প্রদান করেন।
অভিযোগ-৮. গত বছরের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচিতে ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কুষ্টিয়া জেলার সর্বস্তরের জনতা রাস্তায় নেমে আসে। এদিন দুপুর দেড়টা থেকে ৪টার মধ্যে বক চত্বর থেকে অনুমান ৫০ গজ উত্তরে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, বার্মিজ গলিতে সুরুজ আলী বাবু, হরিপুরগামী রাস্তা আড়ং-এর সামনে শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, তুলা পট্টির গলিতে ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজি ও ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে রাস্তার উপর চাকরিজীবী ইউসুফ শেখকে গুলি করে শহীদ করার অভিযোগ আনা হয়।
জুলাই আন্দোলনে ‘জঙ্গি কার্ড’ খেলতে চেয়েছিলেন ইনু: চিফ প্রসিকিউটর: শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, হাসানুল হক ইনু সাহেবের মামলার অবশিষ্ট আর্গুমেন্ট শেষ হয়েছে। আজকে শুধু ল পয়েন্টে হিয়ারিং করেছি। ল পয়েন্টটা হিয়ারিং হচ্ছে এরকম যে, ইনু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সহযোগী পার্টনার ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সকল কর্মকাণ্ডে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। ১৯শে জুলাই ও ৪ঠা আগস্ট হাসিনার সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন। সেই কথা-বার্তাগুলোর মধ্য দিয়ে সেখানে কারফিউ জারি এবং জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে ‘জঙ্গি কার্ড’ খেলা এবং তার কুষ্টিয়ায় পুলিশকে বিভিন্ন রকমের নির্দেশনা দেয়া এবং জুলাই আন্দোলনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে তাদের ওপরে নিপীড়ন বা নির্যাতন চালানো এইসব বিষয়গুলো তার কথোপকথনের মধ্যে ছিল।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই কথোপকথনের রেকর্ডগুলো দিয়ে আমরা পরিষ্কারভাবেই এটি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি বা ইনু সাহেব একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি দেশপ্রেমী মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে তাদের ওপরে নিপীড়ন চালানোর জন্যে নানান কৌশল বা নানান পরিকল্পনা এর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।
