দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে বাংলাদেশ ও ভারত কেবল দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; বরং ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, নদী, সীমান্ত, অর্থনীতি ও রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় জড়িয়ে থাকা দুই অনিবার্য ভূ-রাজনৈতিক সত্তা। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, অন্যদিকে সীমান্ত হত্যা; একদিকে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, অন্যদিকে পানিবণ্টনের দ্বন্দ্ব এই দুই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কখনো উষ্ণ, কখনো শীতল, কখনো সন্দেহপূর্ণ, আবার কখনো কৌশলগত মিত্রতার রূপ নিয়েছে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে এই সম্পর্ক কি সত্যিই সমতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, নাকি এটি ধীরে ধীরে এক ধরনের অসম বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছিল? এমন এক সম্পর্ক, যেখানে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের চেয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে?
স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আবেগ ও কৃতজ্ঞতার ওপর। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের সম্পর্ক চিরকাল আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না; সময়ের সঙ্গে সেখানে প্রবেশ করে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক হিসাব, নিরাপত্তা কৌশল এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রশ্ন। আর সেখান থেকেই শুরু হয় বাস্তবতার রাজনীতি।বাংলাদেশের মানুষ খুব দ্রুত বুঝতে শুরু করে, স্বাধীনতার আবেগ আর রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এক জিনিস নয়।
সীমান্তে গুলি চলতে থাকে, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে, বাণিজ্য ঘাটতি একতরফাভাবে ভারতের পক্ষে যেতে থাকে। অন্যদিকে দিল্লি সবসময় এমন একটি সরকারকেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করেছে, যারা ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে প্রস্তুত।
বিশেষ করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন এক মাত্রা পায়। আওয়ামী লীগ সরকার দিল্লির সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে, যা অনেক সময় কূটনৈতিক ভারসাম্যের সীমা অতিক্রম করেছে বলেই সমালোচনা রয়েছে। ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, ট্রানজিট, সংযোগ, বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনসহ বহু কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেয়েছে?
তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি বছরের পর বছর ঝুলে আছে। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বন্ধ হয়নি। বাণিজ্য বৈষম্য কমেনি। এমনকি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নিয়েও ভারতের অবস্থানকে অনেকেই একপাক্ষিক বলে মনে করছেন।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন বা জনগণের ভোটাধিকারের প্রশ্নে দিল্লির নীরবতা সাধারণ মানুষের মনে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি ধারণা শক্তিশালী হয়েছে যে ভারত মূলত সরকারকেন্দ্রিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়েছে, জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ককে নয়। আর এখানেই তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট।
গত এক দশকে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ যত বেড়েছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও জনমনে তত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল দমন, বিতর্কিত নির্বাচন, মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেও দিল্লির প্রকাশ্য সমর্থন আওয়ামী লীগ সরকারকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছে—এমন ধারণা দেশের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ভারতবিরোধী মনোভাব কেবল কূটনৈতিক ইস্যুতে নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশেও পরিণত হয়েছে।
কিন্তু আমি মনে করি, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার সুযোগ নেই। ভৌগোলিক বাস্তবতা দুই দেশকে একে অপরের অনিবার্য অংশীদার বানিয়েছে। প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত, অভিন্ন নদী, আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগর—সবকিছুই দুই দেশকে সহযোগিতার পথে থাকতে বাধ্য করে। প্রশ্ন হলো, সেই সম্পর্কের ভিত্তি কী হবে? সমতা, সম্মান ও জনগণের স্বার্থ, নাকি কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সমঝোতা?
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বরাবরই দাবি করে এসেছে, তারা ভারতের সঙ্গে শত্রুতা নয়, বরং মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক চায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই বাংলাদেশ “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতিকে সামনে রেখে বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে। তিনি শুধু ভারতনির্ভর কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং মুসলিম বিশ্ব, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও ভারতবিরোধী উগ্র অবস্থানের বদলে জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক সম্পর্কের কথাই বলা হয়েছে। বিএনপি সবসময় এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখেই ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা সম্ভব।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও অবস্থানেও সেই ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তিনি প্রকাশ্যে বহুবার বলেছেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, কিন্তু সেই সম্পর্ক অবশ্যই হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে কোনো বিদেশনীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না—এই বাস্তবতাও এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ভারতকে এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইলে দিল্লিকে কেবল ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে নয়, জনগণের সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। কারণ সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু জনগণের মনোভাব দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক বাস্তবতা নির্ধারণ করে।
তিস্তা ইস্যু তার বড় উদাহরণ। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ন্যায্য হিস্যার পানি চেয়ে আসছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক রাজনীতি ও ভারতের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের কারণে এই চুক্তি বারবার থেমে গেছে। তবে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ভারতের ভূমিকা এখন কি হয় সেটি দেখার জন্য এদেশের মানুষ মুখিয়ে আছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এটিকে কেবল একটি পানিচুক্তি হিসেবে দেখে না; তারা এটিকে মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করে।
একইভাবে ধারাবাহিক সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশের মানুষের মনে ক্ষোভের গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। স্বাধীন দেশের নাগরিকদের সীমান্তে গুলি করে হত্যা করা হবে, আর প্রতিবেশী রাষ্ট্র সেটিকে স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করবে—এটি কোনো সুস্থ সম্পর্কের ভাষা হতে পারে না।
বাংলাদেশ আজ আর ১৯৭২ সালের দুর্বল অর্থনীতির দেশ নয়। তৈরি পোশাক শিল্প, রেমিট্যান্স, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণে দেশটির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান—সবাই এখন বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে। ফলে দিল্লিকেও বুঝতে হবে, ঢাকা আর একমুখী নির্ভরতার রাজনীতিতে আবদ্ধ নেই।
বিশ্বরাজনীতিও দ্রুত বদলাচ্ছে। ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূ-রাজনীতি—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত কেন্দ্র। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন, ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে, তবে সেটিই হবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
আমি মনে করি,বাংলাদেশের জনগণ ভারতবিরোধী নয়; তারা অসম সম্পর্কের বিরোধী। জনগণ বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু মাথানত করে নয়। তারা সহযোগিতা চায়, কিন্তু আত্মসমর্পণের বিনিময়ে নয়। মানুষ চায়, দিল্লি ঢাকাকে একটি সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করুক। জনগণের এই চাওয়া খুবই প্রাসঙ্গিক এবং ন্যায় সঙ্গত।
কারণ ইতিহাস বলে, অসম সম্পর্ক কখনো স্থায়ী হয় না। যেকোনো একতরফা সমীকরণ একসময় ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্রের সম্পর্ক টিকে থাকে তখনই, যখন সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়সঙ্গত আচরণ এবং জনগণের স্বার্থের প্রতিফলন থাকে।
পরিশেষে বলতে চাই, ভারতকে পুরোনো রাজনৈতিক সুবিধাবাদের জায়গা ছেড়ে নতুন বাস্তবতার দিকে এগোতে হবে। দিল্লিকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে কোনো সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আর ঢাকাকেও উপলব্ধি করতে হবে, আবেগ নয়—রাষ্ট্রীয় স্বার্থই কূটনীতির মূল ভিত্তি।
সুতরাং,বন্ধুত্ব হোক সমতার, সহযোগিতা হোক মর্যাদার, আর সম্পর্ক হোক জনগণের স্বার্থকেন্দ্রিক। কারণ অসম বন্ধুত্বের দিন সত্যিই শেষ হয়ে আসছে। সুতরাং সবাইকেই সুষম বন্ধুত্বের দিকেই হাত বাড়াতে হবে।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
