সড়কে ট্রাফিক আইন না মানলেই দেয়া হচ্ছে মামলা। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই ক্যামেরার চোখে ধরা পড়ছে অপরাধ। আর কন্ট্রোল রুম থেকে চলে যাচ্ছে ক্ষুদে বার্তা। যানবাহনের পেছনে ছোটার প্রয়োজন পড়ছে না। সম্প্রতি রাজধানীতে এমন নিয়মই চালু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। এআই ক্যামেরার চোখেই দেয়া হচ্ছে নিয়মভঙ্গের মামলা। ইতিমধ্যে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৫শ’ মামলা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। শুরুতেই রাজধানীর নির্দিষ্ট অংশে এটি চালু হলেও ছয় মাসের মধ্যে পুরো ঢাকা এআই ক্যামেরার আওতায় আসবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট-২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে এআই ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং, ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহনের নম্বর প্লেট শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে সেই তথ্য যাচাই করে মামলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালকের মোবাইলে এসএমএস এবং ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। তবে, কিছু গাড়ির নম্বর প্লেট অস্পষ্ট থাকায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলেও সূত্র জানিয়েছে। মূলত, ঢাকার স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল লাইটের পোলগুলোতে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ডিএমপি’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যে রাজধানীর ৩০ পয়েন্টে এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
এসব ক্যামেরা সফটওয়্যারের মাধ্যমে যানবাহনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মামলা বা অটোমেটিক মামলা করা শুরু করেছে গত সপ্তাহ থেকে। এই সফটওয়্যারটি আইন ভঙ্গকারী যানবাহন শনাক্ত করে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজ তৈরি করছে। এই ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে বিআরটিএ ডাটাবেজের যে ‘কানেক্টিভিটি’ আছে, সেখান থেকে মালিকদের ঠিকানা সংগ্রহের পর ‘প্রসিকিউশন’ চিঠি পাঠানো হচ্ছে। মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে মামলার তথ্য পাঠানো শুরু করেছে ডিএমপি।
বুধবার সরজমিন শাহবাগ, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, সোনারগাঁও মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যালগুলো ঘুরে দেখা গেছে, মোড়ের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত এআই ক্যামেরা দিয়ে সিগন্যাল অমান্য, স্টপলাইন ভঙ্গ ও উল্টো পথে চলাচল- ইত্যাদি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সিগন্যালগুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির প্রভাব পড়েছে কিছুটা। তবে এই সিগন্যালগুলোতে চালক ও পথচারীরা তুলনামূলক বেশি সচেতন। কেননা, বেশ কয়েকমাস ধরেই এই সমস্ত সিগন্যালে সরকারের স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে চালকরা স্বয়ংক্রিয় বাতির প্রতি আগ থেকেই নজর রাখছেন।
তবে এআই প্রযুক্তির সংযুক্তির পর সিগন্যাল পরিবর্তনের সময় অনেক চালকের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে। তবে, মামলার কাজকর্ম ডিএমপি’র হেডকোয়ার্টার্স থেকে নিয়ন্ত্রণ করায় মামলার বিষয়টি নিয়ে কিছুই জানেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাফিক সার্জেন্ট কিংবা ট্রাফিক পরিদর্শকরা। শাহবাগ থেকে সোনারগাঁও পর্যন্ত চারটি সিগন্যালের অন্তত ৩ জন ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, তারা মামলা বা এআই ক্যামেরার বিষয়ে জানেন না। ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, ঢাকায় আগে ৮০টি প্রযুক্তিসম্পন্ন উচ্চক্ষমতার নিরাপত্তা ক্যামেরা (পিটিজেড ক্যামেরা) লাগানো ছিল। তবে সেগুলো থেকে আমরা ফুটেজ নিয়ে মামলার কাজে ব্যবহার করতাম না। এরপর ২৫টি নতুন ক্যামেরা স্থাপনসহ এখন ১০৫ জায়গার ফুটেজ নিতে পারছি আমরা।
যা মামলার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এখন আমাদের কাছে ৩ হাজারের বেশি ফুটেজ রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫শ’ মামলা প্রস্তুত করা হয়েছে। যার কিছু কিছু মেসেজ বা নোটিশ ইতিমধ্যেই প্রাপকের কাছে চলে গেছে। জনবল সংকট থাকায় তথ্য যাচাই বাছাই করে মামলা দিতে এখন দুই থেকে তিনদিন সময় লাগছে। আনিছুর রহমান বলেন, মামলার নোটিশ যাওয়ার পর দায়ী ব্যক্তি অফিসে হাজির হয়ে সমস্ত এভিডেন্স দেখতে পারবেন, এরপর তিনি জরিমানা শোধ করবেন। দায়ী ব্যক্তি বা গাড়ির চালক না আসলে বা অস্বীকৃতি জানালে আমরা মামলা ম্যজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে দেবো।
এর আগে, সোমবার দুপুরে বিমানবন্দর ক্রসিং সৌরশক্তির ‘ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকার সড়কে পূর্ণাঙ্গরূপে স্বয়ংক্রিয় মামলা চালু সম্ভব হবে বলে আশা করছি। সার্জেন্ট বা ট্রাফিক পরিদর্শকদের ম্যানুয়াল মামলা খুব একটা করা লাগবে না। যেকোনো স্থানে ট্রাফিক আইন বা মোটর ট্রান্সপোর্ট আইন ভাঙলে স্বয়ংক্রিয় মামলা হবে। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন গত কয়েক মাসে জাহাঙ্গীর গেট থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল পর্যন্ত সাতটি ক্রসিংয়ে সিগন্যাল লাইট বসিয়েছে। এ ছাড়া গুলশান-২ ও হাইকোর্ট থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল পর্যন্ত আরও কয়েকটি পয়েন্টে কাজ চলছে।
