হঠাৎ করেই বাসায় পড়ে গিয়ে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল দেশের বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমানের। ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। দেয়া হয় লাইফ সাপোর্ট। কিন্তু তিনি যে শেষ পর্যন্ত চলেই যাবেন সেটা ভাবতে পারেনি তার পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। সোমবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন আতাউর রহমান। (ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আগামী জুনে তার ৮৫ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। আতাউর রহমানের কন্যা শর্মিষ্ঠা রহমান জানান, ১লা মে বাসায় পড়ে যাওয়ার পর আতাউর রহমানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এরপর তাকে প্রথমে গুলশানের একটি হাসপাতালে নেয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসকরা জানান, তার আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সাপোর্ট প্রয়োজন। তবে ওই হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা ওই মুহূর্তে না পাওয়ার কারণে পরে তাকে ধানমণ্ডির একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ভর্তির পরই তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, গত শনিবার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়া হয়। কিন্তু আবার অবস্থার অবনতি হলে রোববার তাকে আবার লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। সোমবার দিবাগত রাত ১টায় তার লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়া হয়। চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন আতাউর রহমানকে। এদিকে মঙ্গলবার বিকালে মগবাজারে জানাজা শেষে তার মরদেহ শহীদ বেদিতে রাখা হয়। সেখানে তাকে জানানো হয় শেষ শ্রদ্ধা। এরপর বনানী কবরস্থানে গুণী এই নাট্যব্যক্তিত্বের দাফন সম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী আতাউর রহমান। তিনি একাধারে নাট্যজন, অভিনেতা, মঞ্চ নির্দেশক ও লেখক। ১৯৪১ সালের ১৮ই জুন নোয়াখালীতে জন্ম নেয়া এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব স্বাধীনতাযুদ্ধ-পরবর্তী মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর আতাউর রহমান নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত’র ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকটির মাধ্যমে নাট্য নির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এই প্রতিষ্ঠাতা ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘রক্তকরবী’, ‘ক্রয়লাদ ও ক্রেসিদা’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘অপেক্ষমাণ’- এর মতো নাটকগুলোও নির্দেশনা দিয়েছেন। নাগরিকের বাইরে আতাউর রহমান ‘আগল ভাঙার পালা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘নারীগণ’, ‘রুদ্র রবি ও জালিয়ানওয়ালাবাগ’ নাটকগুলো নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি ‘প্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’, ‘নাটক করতে হলে’, ‘নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা’, ‘লেখনী’সহ নানা বই প্রকাশ করেছেন। অভিনয় করেছেন টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের সাবেক সদস্য আতাউর রহমান বাংলাদেশ নাটকের আপিল কমিটি ও চলচ্চিত্র জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ শাখার, পরে বিশ্ব শাখার সভাপতিও ছিলেন এই নাট্যব্যক্তিত্ব। দেশের সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আতাউর রহমান পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার।
