সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আমিনুল হক। গতকাল সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় টেকনোক্রেট প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই অধিনায়ক। ২০১২ সালে ফুটবলকে আনুষ্ঠানিক বিদায়ের পরেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতির সঙ্গে জড়ান আমিনুল। রাজনীতির পাশাপাশি কাজ করতে থাকেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি’র ইশতেহারে ক্রীড়াক্ষেত্রে সকল পরিকল্পনাই আমিনুলের। কিন্তু গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপি’র হয়ে লড়াই করে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কর্নেল (অব) আব্দুল বাতেনের কাছে হেরে যান সাবেক এই জাতীয় ফুটবলার। তার পরাজয়ে হতবিহ্বল হয়ে পুরো ক্রীড়াঙ্গন। আমিনুল হকের বদলে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নাম শোনা যায় বিসিবি’র সাবেক সভাপতি আলী আজগর লবির। তবে আশা ছাড়েননি আমিনুল। সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রী পরিষদের সর্বোচ্চ ১০ ভাগ টেকনোক্রেক্ট (সংসদ সদস্যের বাইরে) মন্ত্রী পরিষদে থাকতে পারে।
সাধারণত বিশিষ্ট ব্যক্তি যাদের বিশেষ বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও অসাধারণ দক্ষতা এবং দলের ত্যাগী নেতাদের টেকনোক্রেক্ট কোটায় মন্ত্রী করা হয়। বাংলাদেশে কোনো সাবেক ক্রীড়াবিদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে কিংবা টেকনোক্রেস্ট কোটায় কখনো মন্ত্রী হননি। আমিনুল হকই প্রথম টেকনোক্রেক্ট কোটায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন। শপথ নিতে যাওয়ার পথে মানবজমিনকে আমিনুল বলেন, ‘একজন ফুটবলার হিসেবে এই দেশ আমাকে আমিনুল হক বানিয়েছে। আর আমার দল আমাকে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে কাজ করার দায়িত্ব দিচ্ছে। আমরা খেলাধুলাকে নিয়ে নতুন একটি পরিকল্পনা করছি। যেখানে আমাদের সারা বাংলাদেশের প্রায় ৪৯৫টি উপজেলায় স্পোর্টস ভিলেজ তৈরি করতে চাই। যে স্পোর্টস ভিলেজের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলার এবং ইউনিয়নের সবপ্রকারের যারা খেলাধুলাকে পছন্দ করে তাদের উৎসাহিত করতে আমরা এ স্পোর্টস কমপ্লেক্সগুলো নির্মাণের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলাকে ছড়িয়ে দিতে চাই। খেলাধুলার মাধ্যমে আমরা একটি সুস্থ জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে চাই।’ ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতির বাইরে রাখার পরিকল্পনাও আছে তার। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন ফেডারেশন নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়ে আমিনুল।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি আমিনুলের ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু। ফরাশগঞ্জ, আবাহনী, মোহামেডান, মুক্তিযোদ্ধাসহ দেশের সকল শীর্ষ ক্লাবে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে খেলেছেন। গোলের খেলা ফুটবলে গোলরক্ষক হয়েও আমিনুল দীর্ঘদিন ঘরোয়া ফুটবলে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ফুটবলার ছিলেন। জাতীয় ফুটবল দলে তিনি ছিলেন এক নম্বর গোলরক্ষক। ২০০৩ সালের সাফ জয়ের অন্যতম নায়ক তিনি। ২০১০ এসএ গেমসে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক ছিলেন। আন্তর্জাতিক অনেক ম্যাচে তার অসাধারণ গোলরক্ষক পারফরম্যান্সে বাংলাদেশে বড় দলের বিপক্ষে ড্র করেছে কিংবা ন্যূনতম ব্যবধানে হেরেছে। বিশেষ করে পেনাল্টি থেকে গোল সেভ করার দারুণ দক্ষতা ছিল তার। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকও বলা হয় তাকে। ফুটবলার হিসেবে অবসর নেয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে যুক্ত হন আমিনুল হক। গত এক যুগের বেশি সময় অনেক জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সাবেক তারকা ফুটবলার ও বাংলাদেশের অধিনায়কের শরীর রক্তাক্ত ও হ্যান্ডক্যাপের ছবি নাগরিক সমাজে নাড়া দিয়েছিল। বয়সে তরুণ হলেও তার দল বিএনপি’র প্রতি নিবেদন ও ত্যাগের মাত্রা ছিল অসীম।
জাতীয় নির্বাচনে হারলেও ক্রীড়াঙ্গন ও দলীয় অবদান বিবেচনায় আমিনুল হককে টেকনোক্রেক্ট কোটায় মন্ত্রী করার দাবি ছিল ক্রীড়াঙ্গনের। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে সাবেক তারকা ফুটবলারদের মধ্যে মেজর হাফিজ উদ্দিন প্রথম মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘদিন পর আরেক সাবেক জাতীয় ফুটবলার আরিফ খান জয় ক্রীড়া উপমন্ত্রী হন। আমিনুল হক তৃতীয় সাবেক জাতীয় ফুটবলার হিসেবে মন্ত্রী হতে চলেছেন। বিগত তিন চার দশকে (সাদেক হোসেন খোকা, হারুনুর রশিদ, সালাম মুর্শেদী, সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মোর্তজা, হাসানুল হক ইনু, আলী আজরগর লবি, এহসানুল হক মিলনসহ আরও অনেকে) ক্রীড়াবিদ, সংগঠক ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট অনেকেই সংসদ-সদস্য ও মন্ত্রীত্ব করেছেন। কিন্তু তাদের কেউই টেকনোক্রেক্ট ছিলেন না। গতকাল দায়িত্ব নিয়ে সবিচালয়ে যেতে চেয়েছিলেন আমিনুল হক। কিন্তু শপথ কার্যক্রম শেষ হতে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় বাসায় চলে যান তিনি। আজ প্রথমবারের মতো তিনি নিজ মন্ত্রণালয়ে অফিস করবেন।

Mazba Uddin
৩ মাস আগেএতো ভাগবাটোয়া হলো কোন কিছুই মিডিয়া জানতে পারলো না??