মাঠকর্মীর সেই ছেলেটি এখন ২২ গজের নায়ক

মাঠকর্মীর সেই ছেলেটি এখন ২২ গজের নায়ক

ফন্ট সাইজ:

পিতা সুনিল সিলভা একজন গ্রাউন্ডসম্যান। মাঠ পরিচর্যা করে তার সামান্য আয়। মা একজন ফুল বিক্রেতা। পরিবারের আয় সামান্য। তবে দুরন্ত ছেলেটির ছিল ক্রিকেট নিয়ে বড় স্বপ্ন। বলছিলাম পাথুম নিশাঙ্কার কথা। ব্যাট হাতে বাইশ গজে আলো ছড়ালেন আবারো। ছোটবেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য লড়াই করতে হতো তাকে। কিন্তু দারিদ্র্য সেই ছেলেটি দমাতে পারেনি, বরং তাকে বানিয়েছে আরও দৃঢ়চেতা। সোমবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে ৮ উইকেটে হারায় শ্রীলঙ্কা। এই ম্যাচে ৫২ বলে সেঞ্চুরি করে শ্রীলঙ্কাকে সুপার এইটে নিয়ে গেছেন পাথুম নিশাঙ্কা। যেটি এবারের আসরে প্রথম সেঞ্চুরি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দ্বিতীয় শ্রীলঙ্কান ব্যাটার হিসেবে সেঞ্চুরির ঘটনা এটি। এর আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার হিসেবে সেঞ্চুরি করেন মাহেলা জয়াবর্ধনে। ২০১০ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১০০ রানের ইনিংস খেলেন তিনি।
সিংহল ভাষায় ‘নিশাঙ্কা’ শব্দের অর্থ হলো ‘আশা’। নামের মতোই উজ্বল নিশাঙ্কা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৮২ রানের লক্ষ্য তাড়ায় শ্রীলঙ্কার আশার প্রদীপ হন ডানহাতি ওপেনার। ১০ চার ও ৫ ছক্কায় অপরাজিত শতক হাঁকান নিশাঙ্কা। এই ইনিংস দিয়ে অনেক রেকর্ড ভেঙেছেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরিয়ান নিশাঙ্কাই। ২০১৪ বিশ্বকাপে ওমর আকমলের ৯৪ ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আগের সর্বোচ্চ। টি-টোয়েন্টিতে শ্রীলঙ্কার হয়ে একাধিক সেঞ্চুরি করা একমাত্র ব্যাটসম্যান এখন নিশাঙ্কা। তার সেঞ্চুরি দুটি। একটি করে সেঞ্চুরি আছে মাহেলা জয়াবর্ধনে, তিলাকরাত্নে দিলশান ও কুশাল পেরেরার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে রান তাড়ায় তিন অঙ্ক স্পর্শ করা প্রথম ব্যাটসম্যান নিশাঙ্কা। ২০১৮ সালে হারারেতে পাকিস্তানের ফখর জামানের ৯১ ছিল আগের সর্বোচ্চ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গত আসরে সেঞ্চুরি হয়নি একটিও। এবার ৩০তম ম্যাচে এসে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা মিললো নিশাঙ্কার ব্যাটে। পরের ম্যাচে সেঞ্চুরি করেন কানাডার যুবরাজ সামরার। টি-টোয়েন্টির বিশ্বমঞ্চে সবশেষ সেঞ্চুরিটি ছিল ২০২২ বিশ্বকাপে সিডনিতে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নিউজিল্যান্ডের গ্লেন ফিলিপস ১০৪ রানের ইনিংস খেলেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্বাদশ সেঞ্চুরি এটি। তবে রান তাড়ায় শতরান করা তৃতীয় ব্যাটার নিশাঙ্কা। আগে দু’জন ইংল্যান্ডের অ্যালেক্স হেলস ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইল। ২০১৪ আসরে চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১১৬ রানে অপরাজিত ছিলেন হেলস। ২০১৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ১০০ করেন গেইল। রেকর্ডের পাতা উল্টে দেয়া নিশাঙ্কার ক্যারিয়ারের শুরুটা সহজ ছিল না। থাকতেন সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে। সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বানানো শত শত খুপড়ি ঘরের ভিড়ে নিশাঙ্কার বাড়ি খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। কলুতারা বোদিয়া মন্দিরের সামনে তাকে খুঁজে নেন কোচ প্রদীপ নিশান্থা। সেই মন্দিরের সিঁড়িতে বসেই ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তির কাগজে সই করেন নিশাঙ্কা। কিন্তু একাডেমির খরচ বহন করা গরিব বাবা-মায়ের জন্য সহজ ছিল না। এ সময় নিশাঙ্কার পাশে দাঁড়ান ‘জয়রাত্নে ফ্লোরিস্ট’-এর মালিকরা। ফুল বিক্রেতার ছেলেকে ক্রিকেটের জন্য তারা প্রতি মাসে হাতখরচ দিতেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের আগে তাকে ২ লাখ ৫০ হাজার রুপি দেন। ২০২১-এ অ্যান্টিগায় অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখেন নিশাঙ্কা। স্বপ্নযাত্রা আর থামেনি। নিশাঙ্কার ব্যাটে চড়ে লঙ্কানদের স্বপ্ন এখন আকাশচুম্বী। চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কাকে সুপার এইটে তোলার ম্যাচে আকাশের দিকে মুখ তুলে উদযাপন করেন সেঞ্চুরি। হয়তো মনে পড়ছিল সেই মন্দিরের সিঁড়ির কথা, মায়ের হাতের সেই পদ্মফুলের ঘ্রাণের কথা।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন