বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক চাপে। ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে। পাশপাশি সরকারি গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার কমানো, বিদেশে প্রশিক্ষণ বন্ধ করাসহ সভা-সেমিনারের আপ্যায়ন ব্যয় কমানো হয়েছে। অতিরিক্ত সচিবদের বিজনেস ক্লাস বাদ দিয়ে ইকোনমি ক্লাসে ভ্রমণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকার নিজেই ব্যয়সংকোচনের পথে হাঁটছে । এমন এক বাস্তবতায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিদেশ সফরের হোটেলভাড়ার সীমা তুলে দেওয়ার আলোচনা জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে। বিদেশ সফরে রাষ্ট্রের মর্যাদা নাকি পাঁচতারকা সংস্কৃতি? কারণ বিষয়টি শুধু টাকা নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানেরও প্রশ্ন।
বর্তমানে গ্রুপ-১ভুক্ত দেশগুলোতে একজন মন্ত্রী প্রতিদিন হোটেলভাড়া বাবদ সর্বোচ্চ ৪২০ ডলার পান। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫১ হাজার টাকা। প্রতিমন্ত্রীরা পান ৩১২ ডলার, অর্থাৎ ৩৮ হাজার টাকার বেশি। এই অর্থ কোনোভাবেই কম নয়। পৃথিবীর বহু উন্নত শহরেও এই বাজেটে আরামদায়ক, নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ-চারতারকা হোটেলে থাকা সম্ভব।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমান সীমা বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কূটনৈতিক বৈঠকের সময় ভেন্যুর কাছাকাছি উপযুক্ত হোটেল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় প্রতিনিধিদলকে অনুষ্ঠানস্থল থেকে দূরে থাকতে হয়, যা নিরাপত্তা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং কূটনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। লন্ডনে একটি সফরের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, সাধারণ মানের একটি পাঁচতারকা হোটেলের কক্ষ ভাড়া ৮৫০ ডলার পর্যন্ত গিয়েছিল।
এই যুক্তি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। বিশ্বজুড়ে হোটেল ব্যয় বেড়েছে, বিশেষ করে নিউইয়র্ক, লন্ডন, জেনেভা, টোকিও কিংবা প্যারিসের মতো শহরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সময় আবাসন খরচ অনেক বেশি হয়। ২০১২ সালে নির্ধারিত ভাতার হার আজকের বাজার বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না, এটিও সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের আর্থিক বাস্তবতা কি এখন সেই বাড়তি ব্যয় বহনের মতো অবস্থায় আছে?
বাংলাদেশ এখনো একটি উন্নয়নশীল দেশ। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী সীমিত আয়ে জীবনযাপন করে। একজন সাধারণ মানুষ মাসে যে আয় করেন, একজন মন্ত্রী তার চেয়েও বেশি অর্থ একদিনের হোটেলভাড়া হিসেবে পাচ্ছেন। সেই বাস্তবতায় “প্রকৃত ব্যয়” অনুযায়ী সীমাহীন বিল পরিশোধের ধারণা জনগণের কাছে বিলাসিতার প্রতীক হিসেবেই ধরা পড়বে।
সরকার যখন জনগণকে সাশ্রয়ের বার্তা দেয়, তখন সেই সংযম সবার আগে দৃশ্যমান হওয়া উচিত ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে। রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু সিদ্ধান্ত নয়, প্রতীকী বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ দেখতে চায়, দেশের কঠিন সময়ে নেতৃত্বও সংযম দেখাচ্ছে।
এখানে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো জবাবদিহি। নির্দিষ্ট সীমা থাকলে অন্তত ব্যয় নিয়ন্ত্রণের একটি কাঠামো থাকে। কিন্তু “প্রকৃত ব্যয়” ভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে অপচয়, অতিরিক্ত বিল কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কে কোন হোটেলে থাকবেন, কী মানের রুম নেবেন, কোন ব্যয়কে “প্রয়োজনীয়” বলা হবে, এসব নিয়ে বিতর্ক বাড়বে। সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে জনগণের আস্থাও কমে যায়। তবে এটিও ঠিক, কূটনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে গেলে অনেক সময় ভেন্যুর কাছাকাছি থাকা জরুরি হয়। নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের বিষয়ও থাকে। কিন্তু মর্যাদা আর বিলাসিতা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব মানে অতি ব্যয়বহুল হোটেলে অবস্থান করা নয়, বরং পেশাদার ও কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি সফরে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কঠোর সংস্কৃতি আছে। ইউরোপের বহু দেশে মন্ত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট ট্রাভেল গাইডলাইন অনুসরণ বাধ্যতামূলক। কোথায় থাকবেন, কত খরচ করবেন, কোন শ্রেণিতে ভ্রমণ করবেন, সবকিছু নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় থাকে। উন্নত গণতন্ত্রে জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অযথা বিলাসিতা রাজনৈতিকভাবেও নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি জরুরি। আসলে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের মনে রাখতে হবে, তাঁরা শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রতীক নন, তাঁরা জনগণের ট্যাক্সের অর্থের অভিভাবকও। এই দেশের মানুষ এখনো সাদামাটা জীবনযাপনকারী নেতাকে সম্মান করে। জনগণের কষ্টের সময় রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে বিলাসী ব্যয়ের খবর মানুষের মনে দূরত্ব তৈরি করে।
অর্থ মন্ত্রণালয় এই মুহূর্তে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে, সেটি বাস্তবসম্মত বলেই মনে হয়। কারণ সরকার নিজেই এখন ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে। জ্বালানি ব্যয় কমানো হচ্ছে, সরকারি ভ্রমণ ব্যয় কমানো হচ্ছে, সভা-সেমিনারের খরচ কমানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য আলাদা সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে সাংঘর্ষিক মনে হবে।
তবে সমাধান একেবারে কঠোর “না”তেও নেই। বাস্তবতা বিবেচনায় একটি মধ্যপন্থা নেওয়া যেতে পারে। বিদ্যমান সীমা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার বদলে শহরভেদে বা পরিস্থিতিভেদে একটি যৌক্তিক ও নমনীয় সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মৌসুমে ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে, সেটি বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। তবে প্রতিটি অতিরিক্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে আগাম অনুমোদন এবং পরবর্তী অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকতা। একটি দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সংযমের ছাপ থাকা উচিত। সেটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়। একজন মন্ত্রী যদি ২০০ থেকে ৩০০ ডলারের মধ্যে একটি ভালো চারতারকা হোটেলে থাকেন, তাতে বাংলাদেশের মর্যাদা কমে যাবে না। বরং জনগণ মনে করবে, দেশের নেতৃত্ব বাস্তবতা বোঝে, জনগণের কষ্ট বোঝে।
আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রের মর্যাদা শুধু বিলাসবহুল হোটেল দিয়ে মাপা হয় না। বরং নেতৃত্বের স্বচ্ছতা, সংযম, জবাবদিহি এবং দায়িত্ববোধ দিয়েই একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি মূল্যায়িত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জনগণ সরকারের কাছ থেকে যে বার্তা প্রত্যাশা করে, তা হলো সংযমের বার্তা, অপচয় নয়। সাধারণ মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের চাপে হাঁসফাঁস করছে, তখন বিদেশ সফরে মন্ত্রীদের বিলাসী হোটেল নিয়ে আলোচনা মানুষের কাছে অস্বস্তিকর লাগবেই।
সরকার যদি সত্যিই ব্যয় কমাতে চায়, তাহলে সেই বার্তা প্রথমে দৃশ্যমান হতে হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরে। কারণ জনগণের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রে নেতৃত্বের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর দিকেও তাকানো দরকার। ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে বহু ক্ষেত্রে সরকারি সফরে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশটির অনেক মন্ত্রী ও সিনিয়র কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সফরে তুলনামূলক সংযত ব্যয়ের নীতি অনুসরণ করেন। পাকিস্তানেও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় সরকার মন্ত্রীদের বিদেশ সফর, বিলাসী ব্যয় ও ভিআইপি সুবিধা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি সরকারি ব্যয় কমাতে সেখানে মন্ত্রীদের বিজনেস ক্লাস ভ্রমণ ও অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশও যখন অর্থনৈতিক চাপ, ডলার সংকট ও ব্যয় সংকোচনের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন জনগণ স্বাভাবিকভাবেই আশা করবে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই সংযমের উদাহরণ তৈরি হবে। কারণ একটি দেশের মর্যাদা শেষ পর্যন্ত বিলাসবহুল হোটেলের কক্ষে নয়, নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা ও জনগণের অর্থ ব্যবহারে সতর্কতার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

not interested
২ মাস আগেstop unnecessary visitForeign Minter already consumed 10 cr on his visits within 2 months