এবার রাউজানের যুবদল কর্মী চট্টগ্রাম নগরে গিয়ে খুন

এবার রাউজানের যুবদল কর্মী চট্টগ্রাম নগরে গিয়ে খুন

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন রৌফাবাদ এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়েছেন হাসান রাজু (৩২) নামে রাউজানের এক যুবক। এ সময় মোসাম্মৎ রেশমী আক্তার (১১) নামে এক পথচারী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে রৌফাবাদ এলাকার শহীদ মিনার গলিতে এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, নিহত হাসান রাজুর বাড়ি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নে। তার বাবার নাম আবুল কালাম। তিনি বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়ে এ হামলার শিকার হন।

গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া নিহত রাজু এলাকায় ‘বিন্দু মাসীর ছেলে’ নামে পরিচিত ছিলেন। এলাকায় যুবদলের কর্মী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। গত ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত ২৬শে এপ্রিল রাউজানের কদলপুর এলাকায় নাছির উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে রাজুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকেই রাজু আত্মগোপনে ছিলেন।

অন্যদিকে, গুলিবিদ্ধ ১১ বছরের শিশু রেশমী আক্তারকে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। গুলিবিদ্ধ শিশুর বড় ভাই ফয়সাল আহম্মেদ জানান, রেশমী দোকানে যাওয়ার সময় এলাকায় হঠাৎ কয়েকজন সন্ত্রাসী গোলাগুলি শুরু করে। এ সময় একটি গুলি তার চোখে লাগে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত ৯টার পর হঠাৎ একদল দুর্বৃত্ত শহিদ মিয়ার কলোনির প্রবেশমুখে এসে রাজুকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ সময় সেখানে থাকা একটি মেয়ে শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়। গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে তারা শব্দটিকে আতশবাজি কিংবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আওয়াজ মনে করেছিলেন। পরে বাইরে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় রাজু ও গুলিবিদ্ধ শিশুকে পড়ে থাকতে দেখে। দুর্বৃত্তরা রাজুকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে বলে জানান এলাকাবাসী।

সূত্রমতে, গত ২৬শে এপ্রিল রাতে রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ শমসেরপাড়া এলাকায় নাসির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় নিহত নাসিরের মেয়ে লাভলী আক্তার হাসান রাজু জড়িত বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন। নাসির প্রবাসফেরত ও যুবদলের কর্মী ছিলেন। এ ছাড়া নাসির এমপি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন।

অন্যদিকে, হাসান রাজু ছিলেন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ফজল হকের অনুসারী। আর ফজল হকের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে রাউজানের সাবেক এমপি গোলাম আকবর খোন্দকার গ্রুপের সঙ্গে। উত্তর চট্টগ্রামের ত্রাস, হত্যা, অপহরণসহ বহু মামলার আসামি ফজলুল হক ওরফে ফজল হক দীর্ঘদিন বিদেশে পলাতক থাকার পর দেশে ফিরে ফের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খুনসহ নানা অপরাধ কাজে তার নাম বেরিয়ে আসছে।
স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলের দাবি, পুরনো সহযোগীদের সঙ্গে নতুন সদস্য যুক্ত করে তিনি একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। বালু উত্তোলন, মাটি কাটা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকায় পুনরায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার এবং অপরাধ আখড়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে টার্গেট কিলিং। গত ১৯ মাসের ব্যবধানে নগরের বায়েজিদ এবং বাকলিয়া থানা এলাকায় একাধিক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। খুনের এসব ঘটনার বেশির ভাগের নেপথ্যে ছিল বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ইট-বালু-সিমেন্ট সরবরাহ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, বালুমহাল দখল, ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং জায়গা দখল-বেদখল কেন্দ্রিক। এ ছাড়া হাসান রাজুর খুনের ঘটনায়ও জড়িত বড় সাজ্জাদ বাহিনী। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বায়েজিদ থানার ওসি তদন্ত মোহাম্মদ মোস্তাফা কামাল মানবজমিনকে বলেন, এখনো কোনো মামলা হয়নি, তবে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরা আসামিদের ধরতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে রাউজানে বেড়ে যায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম। গত দেড় বছরে রাউজানে অন্তত ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ১৬টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। সর্বশেষ রাজু হত্যাকাণ্ডও এরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন